অক্টোবর ১৪, ২০২৬, ০৯:৫০ পিএম
বিয়ের কথা শুনলেই অবিবাহিত তরুণ-তরুণীদের মুখে কেন তাৎক্ষণিক আনন্দের মুচকি হাসি ফুটে ওঠে, তার ব্যাখ্যা দিয়েছে আচরণবিজ্ঞান ও মানব মনস্তত্ত্ব। কোনো আড্ডায় বা পারিবারিক পরিবেশে ‘বিয়ে করেছেন?’ কিংবা বিয়ের প্রসঙ্গ উঠলেই বেশিরভাগ অবিবাহিত মানুষের মধ্যে এক ধরনের রোমান্টিক অনুভূতি ও ভবিষ্যৎ জীবনের সুখস্মৃতি জেগে ওঠে। গবেষকদের মতে, এই অনুভূতির পেছনে মানব মস্তিষ্কের নিজস্ব নিউরোকেমিক্যাল প্রক্রিয়া, শৈশবের সামাজিক শিক্ষা ও অবচেতন মনের গভীর প্রত্যাশা একসাথে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।
মস্তিষ্কের রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া এই ভালো লাগার মূল জৈবিক ভিত্তি।
চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, বিয়ে নিয়ে ভাবার সাথে মানুষের মস্তিষ্কের আনন্দ বা পুরস্কার প্রক্রিয়ার সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে। ভবিষ্যতে একজন বিশ্বস্ত জীবনসঙ্গী পাওয়ার কল্পনা বা গভীর ঘনিষ্ঠতার প্রত্যাশা মানুষের মনের ভেতরে ইতিবাচক আবহ তৈরি করে। প্রত্যাশিত কোনো মধুর অনুভূতির কথা ভাবলেই মস্তিষ্কে ডোপামিন নামক রাসায়নিক উপাদানটির সক্রিয়তা বৃদ্ধি পায়, যা মানবদেহে উচ্ছ্বাস সৃষ্টি করে। এর পাশাপাশি সামাজিক বন্ধন, নির্ভরতা ও মানসিক নৈকট্য গড়ে তোলার সাথে সংশ্লিষ্ট অক্সিটোসিন হরমোনের ক্রিয়াশীলতাও তখন অনুভূতির গভীরতা বাড়িয়ে দেয়। তবে কেবল শব্দটি উচ্চারিত হলেই সবার মস্তিষ্কে একই মাত্রায় এই হরমোন নিঃসৃত হয় না; ব্যক্তির মানসিক স্থিতি এবং বিয়ে সম্পর্কে নিজস্ব অভিজ্ঞতার ওপর এর গভীরতা নির্ভরশীল।
শৈশবের সামাজিক পরিমণ্ডল ও অবচেতন মন মানুষের ভাবনাকে প্রভাবিত করে।
ছোটবেলা থেকে নাটক, সিনেমা, রূপকথার গল্প কিংবা পরিবারের বর্ণাঢ্য বিয়ের অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করে অবচেতন মনেই বিবাহবন্ধন সম্পর্কে একটি আকর্ষণীয় ধারণা তৈরি হয়। নতুন পোশাক, চোখধাঁধানো আলোকসজ্জা, প্রিয়জনদের সান্নিধ্য এবং যৌথ জীবন শুরুর উৎসবমুখর স্মৃতিগুলো এই ইতিবাচক আবহকে স্থায়ী রূপ দেয়।
অধিকাংশ অবিবাহিত মানুষের কাছে বিয়ে মানে নিজের একান্ত ভাবনার একজন বিশ্বস্ত অংশীদার খুঁজে পাওয়া।
সেই বিশেষ মানুষের সাথে মনের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়া এবং পারস্পরিক সহায়তায় একটি স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সুযোগ মানুষের ভেতর স্বপ্ন বুনে দেয়। ফলে আলোচনার মাঝে বিয়ের প্রসঙ্গ এলেই মানুষ নিজের অজান্তেই ভবিষ্যৎ কল্পনায় হারিয়ে যায় এবং সেই অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটে তাদের অনৈচ্ছিক হাসিতে।
সামাজিক ও ধর্মীয় অনুশাসনও এই মানসিক উচ্ছ্বাস তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
দক্ষিণ এশিয়ার পারিবারিক কাঠামোয় বিয়েকে ব্যক্তিজীবনের সবচেয়ে সম্মানজনক ও অপরিহার্য অধ্যায় হিসেবে দেখা হয়। নিজস্ব পরিবার প্রতিষ্ঠা, সামাজিকভাবে সম্পর্কের বৈধ স্বীকৃতি এবং জীবনের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার প্রতীক হিসেবে বিয়ে তরুণ প্রজন্মের কাছে একটি নিরাপদ আশ্রয়ের রূপ নেয়।
একইভাবে ইসলাম ধর্মেও দাম্পত্য জীবনকে বিশেষ মর্যাদা ও প্রশান্তির উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
পবিত্র কুরআনের সূরা আর-রুমের ২১ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে, পরম করুণাময় মানুষের মধ্য থেকেই তাদের জীবনসঙ্গী সৃষ্টি করেছেন, যেন তারা একে অপরের সান্নিধ্যে পরম প্রশান্তি লাভ করতে পারে এবং পরস্পরের মধ্যে গভীর ভালোবাসা ও অনুগ্রহ সঞ্চার করে দিয়েছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন হাদিসেও শারীরিক ও সামর্থ্যবান যুবসমাজকে সময়মতো বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সুস্পষ্ট নির্দেশনা ও উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে।
মূলত ভালোবাসা, আজীবন পাশে থাকার মানসিক নির্ভরতা ও একটি সুন্দর আগামী গড়ার যৌথ আশাবাদ অবিবাহিতদের হৃদয়ে আনন্দের দোলা দেয়। তবে সমাজের সবার কাছে বিয়ের অনুভূতি যে সবসময় আনন্দের হবে, বিষয়টি এমন নয়; অতীত তিক্ত অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি কিংবা ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের অগ্রাধিকারের কারণে কোনো কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে বিয়ের আলোচনা ভিন্ন আবেগ বা ভাবনারও জন্ম দিতে পারে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন