অক্টোবর ১৪, ২০২৬, ১০:২৭ পিএম
সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ও দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ২০২৭ সালের মধ্যে একটি সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করতে যাচ্ছে সরকার। সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন, যুগোপযোগী এই আইনটি চূড়ান্ত করতে মন্ত্রণালয় আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে। বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এক জাতীয় গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই তথ্য জানান। জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা দিবস ২০২৬ উপলক্ষে ‘বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তা উন্নয়নে সরকারের অঙ্গীকার’ শীর্ষক এই আলোচনার যৌথ আয়োজন করে ব্র্যাকের রোড সেফটি প্রোগ্রাম ও রোড সেফটি কোয়ালিশন বাংলাদেশ।
দুর্ঘটনা হ্রাসে সরকারের নানামুখী কাঠামোগত পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন মন্ত্রী।
তিনি উল্লেখ করেন, মোটরসাইকেল চালকদের জন্য হেলমেটের মান আন্তর্জাতিক মানে হালনাগাদ করা, যানবাহনের গতিসীমা নির্ধারণ ও তার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে নির্দেশিকা তৈরি, এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মহাসড়কে আন্ডারপাস নির্মাণ, ধীরগতির ও স্থানীয় যানবাহনের জন্য বাম পাশে পৃথক লেন তৈরির প্রকল্প গ্রহণ, পথচারী ও শিক্ষার্থীদের নিরাপদ রাস্তা পারাপার নিয়ন্ত্রণ এবং আধুনিক সড়ক তথ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিচ্ছে প্রশাসন।
তবে এককভাবে নয়, সম্মিলিত সমন্বয়ের তাগিদ দেন তিনি।
সড়কমন্ত্রী স্পষ্ট করেন, সরকার ও বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান সড়কের মানোন্নয়নে কাজ করলেও সমন্বিত উদ্যোগের ঘাটতির কারণে এখনো কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। সড়ক নিরাপত্তা রক্ষা কেবল নির্দিষ্ট একটি দিবসের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে বছরজুড়ে টেকসই কার্যক্রম পরিচালনার আহ্বান জানান তিনি। মন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দেন, ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির হার অর্ধেকে নামিয়ে আনতে সরকার, উন্নয়ন সহযোগী, বেসরকারি সংস্থা এবং পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোকে একযোগে মাঠে থাকতে হবে।
পরিবহন খাতের প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম বন্ধে কঠোর অবস্থানের বার্তা দেন বিশেষ অতিথি।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস বলেন, দেশের দীর্ঘদিনের সনাতন ও অনিরাপদ সড়ক ব্যবস্থাপনার কারণে সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। এই সংকট থেকে উত্তরণে পরিবহন খাতে আমূল পরিবর্তন আনা জরুরি। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন এবং এই খাতের দীর্ঘদিনের মাফিয়াতন্ত্র ভেঙে দেওয়ার জোর প্রচেষ্টা চলছে। পরিবহন মালিক, শ্রমিক সংগঠন, পুলিশ প্রশাসন ও গণমাধ্যম সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করলে দ্রুত ইতিবাচক ফল আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সরকারের নীতিগত অবস্থানের ব্যাখ্যা দেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক।
তিনি জানান, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব পেয়েছে। অবকাঠামো নির্মাণের প্রতিটি প্রকল্পে নিরাপত্তার দিকটি বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি পেশাদার চালকদের নিয়মিত আধুনিক প্রশিক্ষণ, তাদের সার্বিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং ন্যায্য বেতন-ভাতার কাঠামো নিশ্চিত করার বিষয়গুলোও নীতিগতভাবে বিবেচনা করছে মন্ত্রণালয়।
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্যে ব্র্যাকের রোড সেফটি প্রোগ্রামের পরিচালক আহমেদ নাজমুল হুসেইন বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরেন। এরপর দেশের সড়ক নিরাপত্তার সামগ্রিক পরিস্থিতি, সরকারের প্রতিশ্রুতি, সাম্প্রতিক উন্নয়ন ও আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয় রূপরেখা উপস্থাপন করেন প্রোগ্রামটির ব্যবস্থাপক এম খালিদ মাহমুদ।
উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে বিশেষজ্ঞরা সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন এবং ‘নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা’ বা সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচের ওপর জোর দেন। বক্তারা উল্লেখ করেন, আধুনিক বিজ্ঞান অনুযায়ী সড়কে মৃত্যু ও পঙ্গুত্ব প্রতিরোধযোগ্য একটি বিষয়। এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায় কেবল পথচারী বা সাধারণ চালকের ওপর চাপালে চলবে না; নীতিনির্ধারক, সড়ক অবকাঠামো কর্তৃপক্ষ, পরিবহন সংস্থা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও স্বাস্থ্য খাতের সমন্বিত জবাবদিহি প্রয়োজন।
বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব শরফ উদ্দিন আহমদ, পুলিশ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা, বিশ্বব্যাংক ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধিরা, রোড সেফটি কোয়ালিশন বাংলাদেশের সদস্যবৃন্দ, বিশ্ববিদ্যালয় গবেষক, দুর্ঘটনা প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞ এবং গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটিভের প্রতিনিধিরা।
‘নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’—এই প্রতিপাদ্যকে ধারণ করে আয়োজিত আলোচনায় বক্তারা দ্রুত খসড়া আইনটি চূড়ান্ত করে জনস্বার্থে তা কার্যকরের জোর দাবি জানান।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন