অক্টোবর ১৪, ২০২৬, ০৮:১৫ পিএম
বৈদেশিক কর্মসংস্থানে যুক্ত প্রবাসীদের রক্তজল করা পরিশ্রম ও আয়ে দেশের অর্থনৈতিক চাকা সচল রয়েছে বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। বুধবার (১৪ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত এক বিশেষ সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি এই মূল্যায়ন তুলে ধরেন। অভিবাসন গবেষণাকারী সংস্থা রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (আরএমএমআরইউ) ৩০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এবং ‘সোনার মানুষ সম্মিলন-২০২৬’ উপলক্ষে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
রেমিট্যান্সের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করার ডাক দেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি বলেন, এমন একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা প্রয়োজন যেখানে অভিবাসন প্রক্রিয়া হবে নিরাপদ ও হয়রানিমুক্ত। বিশ্ববাজারে কর্মসংস্থান হবে সম্মানজনক এবং দক্ষ জনশক্তি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দেশের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান দৃঢ় করবে। তিনি প্রত্যাশা করেন, বিদেশে কর্মরত শ্রমিক ও দেশে ফিরে আসা অভিবাসীরা যেন জাতীয় প্রবৃদ্ধির সমান অংশীদার হতে পারেন।
রেমিট্যান্সের প্রতিটি উপার্জনের পেছনে তীব্র মানবিক শ্রম ও ত্যাগ জড়িয়ে থাকার কথা স্মরণ করিয়ে দেন তিনি।
তিনি উল্লেখ করেন, প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের প্রতিটি ডলারের পেছনে একটি করে পরিবারের স্বপ্ন ও দীর্ঘশ্বাস থাকে। তাই অভিবাসী কর্মীদের সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা এবং তাদের পাঠানো সঞ্চয়কে জাতীয় অগ্রগতিতে কাজে লাগানো রাষ্ট্রের সমন্বিত দায়িত্ব।
পরিসংখ্যান তুলে ধরে রাষ্ট্রপ্রধান বলেন, সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসী শ্রমিকরা দেশে প্রায় ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পাঠিয়েছেন। দেশের অর্থনীতি যে এখনও সক্ষমতার সাথে টিকে রয়েছে, তার পেছনে এই রেমিট্যান্সের অবদান সবচেয়ে বেশি। তৈরি পোশাক খাত এবং প্রবাসীদের প্রেরিত এই দুটি খাতই মূলত বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতির মূল মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করছে।
তবে উপযুক্ত প্রশিক্ষণের অভাব ও প্রবাসীদের বাস্তব সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি আক্ষেপ করে বলেন, বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়ার সময় অধিকাংশ কর্মীকে আমরা প্রয়োজনীয় কাজের দক্ষতায় পুরোপুরি সক্ষম করে তুলতে পারি না। ফলে একটি বিশাল অংশ অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে বিদেশে পাড়ি জমান। অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নথিপত্র ছাড়াই তারা পা বাড়ান এবং যে কাজের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয় তা দক্ষতার সাথে করতে না পেরে বিভিন্ন দেশে মানবেতর জীবন কাটাতে বাধ্য হন।
মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো পরিদর্শনের স্মৃতিচারণ করে তিনি জানান, সেখানে প্রবাসী শ্রমিকরা অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করে নিজের সর্বস্ব দেশে পাঠিয়ে দেন। অথচ তাদের সবচেয়ে বেশি সম্মান রাষ্ট্রের প্রাপ্য ছিল।
অতীতের অভিবাসন পরিস্থিতির সাথে বর্তমান ব্যবস্থার বৈপরীত্য তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি।
তিনি জানান, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান একবার মধ্যপ্রাচ্য সফর শেষে এসে জানিয়েছিলেন যে, সৌদি আরব তাদের পৌরসভার কাজের জন্য বাংলাদেশ থেকে ১০ হাজার শ্রমিক নেবে। তখনকার শর্ত ছিল আবেদনকারীদের শুধু নিজস্ব পাসপোর্ট তৈরি করতে হবে; উড়োজাহাজের টিকিটসহ যাবতীয় খরচ সৌদি কর্তৃপক্ষ বহন করবে। অথচ বর্তমান চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। একজন কর্মীকে বিদেশে যেতে হলে মধ্যস্বত্বভোগী ও বিভিন্ন সংস্থার রিক্রুটিং খরচ মিলিয়ে পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা গুনতে হচ্ছে। এই অতিরিক্ত ব্যয় ও অভিবাসীদের ভোগান্তির জন্য মধ্যস্বত্বভোগী এবং প্রভাবশালী ব্যক্তি ও এজেন্সির দায় রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
পরিস্থিতি উত্তরণে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
উপজেলা পর্যায়ে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু এবং প্রবাসী কার্ড প্রবর্তনের মতো সরকারি উদ্যোগের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে রাষ্ট্রপতি আরও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির তাগিদ দেন। একই সাথে তিনি দেশে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সাহসী ভূমিকার কথা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেন। অভিবাসীদের সার্বিক সুরক্ষা জোরদারে প্রস্তাবিত ‘অভিবাসন দশক’ বাস্তবায়নের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করার জন্য তিনি প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রীকে অনুরোধ জানান।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন। পরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সাতটি বিভাগে ‘সোনার মানুষ সম্মাননা স্মারক’ ও ক্রেস্ট গুণীজনদের হাতে তুলে দেন রাষ্ট্রপতি।
অনুষ্ঠানে সংগঠনের নীতিগত রূপরেখা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের নির্বাহী পরিচালক ড. তাসনীম সিদ্দিকী এবং স্বাগত বক্তব্য দেন সংস্থাটির উপ-নির্বাহী পরিচালক মোতাসিম বিল্লাহ।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন