রবিবার, ০৪ অক্টোবর, ২০২৬,
ডিমের বাজার

ডিমের দাম প্রতিবেশীদের চেয়েও বেশি বাংলাদেশে

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ৪, ২০২৬, ১০:৪১ পিএম

ডিমের দাম প্রতিবেশীদের চেয়েও বেশি বাংলাদেশে

নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রাণিজ আমিষের অন্যতম প্রধান উৎস ডিমের বাজারে অস্থিরতা কিছুতেই থামছে না। অভ্যন্তরীণ বাজারে এক ডজন ডিমের দাম বেড়ে পৌঁছেছে ১৬০ টাকায়, যা প্রতিবেশী দেশ ভারত, পাকিস্তান এমনকি শ্রীলঙ্কার তুলনায়ও লক্ষণীয়ভাবে বেশি। রাজধানীর খুচরা বাজারে প্রতি হালি ডিম বিক্রি হচ্ছে ৫৫ টাকা দরে, যেখানে মাত্র এক মাসের ব্যবধানে হালিতে দাম বেড়েছে ৫ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে এই বৃদ্ধির হার ১০ শতাংশেরও বেশি ছাড়িয়ে গেছে। অতিরিক্ত দামের ধাক্কায় সাধারণ শ্রমজীবী ও নিম্নবিত্ত মানুষ ডিম খাওয়ার পরিমাণ অর্ধেকে নামিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছেন।

আগে যেখানে দিনে দুই বেলা সকালে ও রাতে ডিম খাওয়ার সুযোগ থাকত, এখন অনেকেই তা কমিয়ে দিনে এক বেলায় সীমাবদ্ধ করেছেন। চার সদস্যের একটি পরিবারে এক হালি ডিম কিনে দুই বেলা ভাগ করে খাওয়ার মতো চরম বাস্তবতা তৈরি হয়েছে বাজারে। নিম্ন আয়ের ক্রেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানাচ্ছেন, ধনীদের জন্য এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সামান্য হলেও দিনে এনে দিনে খাওয়া মানুষের পুষ্টি নিরাপত্তা এখন পুরোপুরি হুমকির মুখে পড়েছে। পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ডজন ডিমের দাম যেখানে ১২০ থেকে ১৩০ বা ১৪০ টাকা থাকা স্বাভাবিক ছিল, সেখানে বর্তমান দর সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে।

বিক্রেতারা দাবি করছেন, পাইকারি মোকামে অতিরিক্ত দাম ও উৎপাদন সংশ্লিষ্ট খরচের ঊর্ধ্বগতির কারণেই খুচরা বাজারে এমন অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, মুরগির খাদ্য বা ফিডের চড়া দাম, ওষুধপত্রের অতিরিক্ত মূল্য, খামারের বিদ্যুৎ বিল এবং পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় খামারিরা উৎপাদন খরচ সামলাতে পারছেন না। পাশাপাশি বর্ষাকালে বৃষ্টিতে শাকসবজি নষ্ট হওয়ায় বাজারে ডিমের তাৎক্ষণিক বাড়তি চাহিদা তৈরি হওয়াও দাম বাড়ার একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন কেউ কেউ। তবে বাজার সংশ্লিষ্ট অনেক বিক্রেতা জানান, সরবরাহ ঘাটতির চেয়েও আড়তদার ও বড় পাইকারদের কারসাজি দাম বাড়ার পেছনে মূল নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে।

অথচ একই সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের খুচরা বাজারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রতিবেশী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে এক ডজন ডিমের গড় বিক্রয়মূল্য বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৪৬ টাকা। পাকিস্তানে আরও কমে রাজধানী ইসলামাবাদে এক ডজন ডিম মিলছে মাত্র ১১৬ টাকায়। চরম অর্থনৈতিক সংকট পেরিয়ে আসা শ্রীলঙ্কায় প্রতি ডজন ডিমের দাম প্রায় ১৩৮ টাকা। কেবল গৃহযুদ্ধ ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে বিধ্বস্ত মিয়ানমারে ডিমের ডজন বিক্রি হচ্ছে ৪৯২ টাকায়। মিয়ানমার বাদে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ভেতরে বর্তমানে বাংলাদেশেই ডিমের দাম সর্বোচ্চ শিখরে অবস্থান করছে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ডিমের বাজারে অবাধ প্রতিযোগিতার ধারাবাহিক অভাব ও গুটিকয়েক প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীলতাই এই অস্থিতিশীলতার প্রধান কারণ। কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম জানান, ডিমের বাজারে সবসময়ই একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গোপনে সক্রিয় থাকে। তিনি উল্লেখ করেন, বাজারে সুস্থ বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে, কারণ ডিমের সামগ্রিক উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা ক্রমশ গুটিকয়েক বৃহৎ করপোরেট কোম্পানির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। গ্রামীণ পারিবারিক পোলট্রি খামারগুলোর বিকাশ ও উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হলে বাজারে বহুমুখী উৎস থেকে সরবরাহ তৈরি হতো এবং সিন্ডিকেটের একচেটিয়া প্রভাব ভেঙে ভারসাম্য ফিরে আসত বলে তিনি অভিমত দেন।

জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম জানান, বাজারে দৃশ্যমান কিংবা অদৃশ্য সিন্ডিকেশনের তৎপরতা থাকলেও নজরদারি জোরদার রাখা হয়েছে। তিনি জানান, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিভিন্ন পাইকারি মোকাম ও আড়তে নিয়মিত তদারকি অভিযান পরিচালনা করছে এবং অনিয়ম পেলে জরিমানাও করা হচ্ছে। তবে তদারকির মাত্রা এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ সীমায় রাখতে হচ্ছে যাতে প্রশাসনিক চাপের মুখে ব্যবসায়ীরা ডিমের স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বন্ধ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারে। উৎপাদন খরচের অজুহাতে ডিমের এই লাগামহীন দাম অবিলম্বে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির পুষ্টির ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক রূপ নেবে।