রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ধাক্কা

এআই ধাক্কায় ফ্রিল্যান্সারদের আয় কমল ৮০ শতাংশ

তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬, ০৬:২০ পিএম

এআই ধাক্কায় ফ্রিল্যান্সারদের আয় কমল ৮০ শতাংশ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং খাতে বড় ধরনের আয়ের ধস নেমেছে। দেশের প্রায় সাড়ে তিন লাখ তরুণ ফ্রিল্যান্সার বার্ষিক এক বিলিয়ন ডলারের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আনলেও সাম্প্রতিক সময়ে প্রাথমিক স্তরের কাজে চরম সংকট দেখা দিয়েছে। বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে ডেটা এন্ট্রি, অনুবাদ, প্রাথমিক কনটেন্ট রাইটিং, ট্রান্সক্রিপশন ও সাধারণ ছবি সম্পাদনার মতো সহজ কাজগুলোর চাহিদা দ্রুত কমছে। এআই টুলের সাহায্যে ক্লায়েন্টরা মুহূর্তেই প্রাথমিক ড্রাফট বা ডিজাইন তৈরি করে নেওয়ায় স্থানীয় কর্মীদের আয় ক্ষেত্রবিশেষে সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।

সহজ কাজের বাজার হারালেও উচ্চ দক্ষতার প্রযুক্তি সেবা এখন আয়ের নতুন পথ দেখাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে ফ্রিল্যান্সিং পেশায় যুক্ত থাকা মাঠপর্যায়ের কর্মীরা জানান, বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মগুলোতে এখন নিয়মিত কাজের প্রস্তাব উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। ২০১১ সাল থেকে ফ্রিল্যান্সিং করা এমরাজিনা ইসলাম জানান, একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান হারানোর পর তার ব্যক্তিগত ও দলীয় আয় ৮০ শতাংশের বেশি কমেছে। আগে যেখানে ১৫ জনের একটি পূর্ণাঙ্গ দল নিয়ে গ্রাফিক ডিজাইন ও ওয়েব ডেভেলপমেন্টের কাজ পরিচালিত হতো, বর্তমানে এআই টুলের সহজলভ্যতায় অতি অল্প কর্মী দিয়েই প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ সেরে ফেলছে। ফলে প্রাথমিক দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল কর্মীরা এখন পেশাগত অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন।

বাণিজ্যিক আলোকচিত্র ও স্টক ছবির বাজারেও আঘাত হেনেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। প্রায় দুই দশক ধরে পেশাদার আলোকচিত্রের সঙ্গে যুক্ত ইউসুফ তুষার জানান, ক্যালেন্ডার, বিজ্ঞাপন ও বাণিজ্যিক পণ্যের শুটিংয়ে নির্মাতারা এখন আলোকচিত্রীদের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি এআই সফটওয়্যারের মাধ্যমে ছবি তৈরি করে নিচ্ছেন। এর ফলে তার ব্যক্তিগত আয় প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গেছে। চলচ্চিত্রের যুগ থেকে ডিজিটাল ক্যামেরায় রূপান্তরের চেয়েও এআই প্রযুক্তির এই ধাক্কা অনেক বেশি দ্রুতগতির ও গভীর বলে তিনি উল্লেখ করেন। অন্যদিকে প্রায় ১৪ বছর ধরে কাজ করা ঢাকার ফ্রিল্যান্সার কাজী মামুন জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে সাধারণ কাজের সুযোগ কমে গেলেও অবশিষ্ট কাজগুলোর জন্য অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা তীব্র আকার ধারণ করেছে। তার নিজের কাজ প্রায় ২৫ শতাংশ কমে গেছে। আপওয়ার্ক বা ফাইভারের মতো তৃতীয় পক্ষের উন্মুক্ত মার্কেটপ্লেসের বাইরে থাকা সরাসরি ক্রেতাদের সাথে যোগাযোগের কারণে তার পাঁচ সদস্যের দল এখনো কাজ সচল রাখতে পারছে। তার মতে, অনেক ফ্রিল্যান্সারের কাজের পরিধি ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ায় অনেকেই মার্কেটপ্লেস ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।

আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের চাহিদা কমলেও এআই-সংক্রান্ত উচ্চ দক্ষতার কাজের ক্ষেত্রে বিপরীত চিত্র তৈরি হয়েছে। আপওয়ার্কের হিসাব মতে, ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে তাদের প্ল্যাটফর্মে এআইভিত্তিক কাজের সুযোগ ২৫ শতাংশ এবং প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং সংক্রান্ত প্রকল্পের চাহিদা ৫২ শতাংশ বেড়েছে। এসব জটিল প্রযুক্তির কাজে যুক্ত পেশাজীবীরা সাধারণ কাজের চেয়ে গড়ে প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি পারিশ্রমিক পাচ্ছেন। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুর বলেন, বৈশ্বিক সেবা খাতের বাজার দ্রুত এআই-নির্ভর হয়ে উঠছে এবং এই বাজারে টিকে থাকার মতো দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে দেশকে এখনই নীতিগত মনোযোগ দিতে হবে।

দেশের প্রচলিত ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতাকেও এই সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ ফ্রিল্যান্সিং ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির চেয়ারম্যান তানজিবা রহমান জানান, দেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এখনো প্রাথমিক স্তরের বা এন্ট্রি লেভেলের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যা এআই মুহূর্তের মধ্যে করতে পারে। গণিত, পরিসংখ্যান, উচ্চতর গবেষণা, জটিল সমস্যা সমাধান ও মানবিক বিচার-বিশ্লেষণের মতো ক্ষেত্রগুলোতে স্থানীয় কর্মীরা পিছিয়ে রয়েছেন। এই রূপান্তর মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক চাহিদার সাথে সামঞ্জস্য রেখে যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ এবং উচ্চদক্ষ মেন্টর তৈরির ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।