শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ঝুঁকি

মানবজাতির জন্য ধীরে ধীরে হুমকি হয়ে উঠছে এআই

তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬, ১০:২১ এএম

মানবজাতির জন্য ধীরে ধীরে হুমকি হয়ে উঠছে এআই

ছবি: Ai

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার ও বহুমুখী সক্ষমতা বৃদ্ধির সমান্তরালে বিশ্বজুড়ে মানবজাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তীব্রতর হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ দুটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গণিত ও কোডিংয়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতির তথ্য প্রকাশের পাশাপাশি সতর্কবার্তা দিয়েছে যে ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি মানবজাতির জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ফাইলের কাজ সম্পাদন, বার্তা প্রেরণ, টিকিট বুকিং ও কোড লেখার মতো জটিল প্রক্রিয়া এখন এআই এজেন্টের মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ড এখনো সরাসরি মানুষের নির্দেশে নিয়ন্ত্রিত হলেও অদূর ভবিষ্যতে প্রযুক্তিটিকে বিদ্যুৎ গ্রিড, শেয়ারবাজার, ইন্টারনেট অবকাঠামো কিংবা সরাসরি সামরিক প্রতিরক্ষার মতো স্পর্শকাতর ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হলে অনাকাঙ্ক্ষিত বিপর্যয়ের ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। এমন শঙ্কা বর্তমানে বহুলাংশে অনুমাননির্ভর হলেও প্রযুক্তিবিদদের ভাবিয়ে তুলছে।

ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক কিংবা গুগলের মতো বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিকর ব্যবহার রোধে তাদের সিস্টেমে শক্ত নিরাপত্তা দেয়াল গড়ে তুলেছে। সাধারণ অনুরোধে ক্ষতিকর তথ্য সরবরাহ আটকে দিলেও তা পুরোপুরি সুরক্ষিত নয়। সম্প্রতি গবেষকদের একটি দল কাব্যিক ভাষার রূপক ব্যবহার করে ৩১টি শীর্ষ এআই কাঠামোর প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ বা ফিল্টার ভেঙে ফেলতে সক্ষম হয়েছেন। এই নিরাপত্তাহীনতা রোধে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি বাজারে ছাড়ার আগেই কঠোর পরীক্ষা ও সরকারি তদারকির প্রস্তাব উঠেছে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এমন পর্যালোচনার জন্য স্বেচ্ছামূলক কাঠামো তৈরির নির্বাহী আদেশ জারি করেছিলেন। কোনো সংকটময় মুহূর্তে সিস্টেম পুরোপুরি বন্ধ করার লক্ষ্যে জরুরি সুইচ তৈরির সুপারিশও এসেছে, যদিও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন কেবল এমন প্রতিরোধ ব্যবস্থা সব বিপদ সামলানোর জন্য পর্যাপ্ত নয়।

সুপারইন্টেলিজেন্স অর্জনের সক্ষমতা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও গণিত ও প্রোগ্রামিংয়ের মতো জটিল ক্ষেত্রে কৃত্রিম মেধা ইতিমধ্যে মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে ছাড়িয়ে যেতে শুরু করেছে। তবে সাধারণ বাস্তব জ্ঞান কিংবা পারিপার্শ্বিক বিচারবুদ্ধির ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা এখনো স্পষ্ট। ক্যানসার নিরাময়, বিশ্ব ক্ষুধা মুক্তি কিংবা স্থায়ী শান্তির রূপরেখা তৈরিতে এআই ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি থাকলেও তা এখন কেবল প্রাথমিক সম্ভাবনার পর্যায়ে আটকে আছে। রোগ প্রতিরোধী ওষুধ গবেষণায় এটি গতি আনলেও চিকিৎসাব্যবস্থার বিশাল কর্মযজ্ঞে প্রযুক্তিটি নিছক সহায়ক ভূমিকা পালন করছে মাত্র।

কর্মসংস্থানের চিরাচরিত মানচিত্রেও কৃত্রিম মেধা গভীর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। কায়িক শ্রমের পেশাগুলো আগে বিলুপ্ত হওয়ার যে ধারণা ছিল, তাকে পাল্টে দিয়ে প্রযুক্তিটি এখন আঘাত হানছে বুদ্ধিবৃত্তিক খাতে। লেখক, গ্রাফিক ডিজাইনার, হিসাবরক্ষক, ব্যক্তিগত সহকারী ও প্রোগ্রামারদের বহুবিধ কাজ এআই নিজেই করে নিচ্ছে। সিলিকন ভ্যালির আধুনিক স্টার্টআপগুলো বিপুলসংখ্যক কর্মীর পরিবর্তে সীমিত জনবল দিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর আউটপুট তৈরি করছে। এর ফলে দক্ষ পেশাদারদের পেশাগত ভবিষ্যৎ বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের সংকটের পাশাপাশি প্রযুক্তিটির কারণে পরিবেশের ওপর অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হচ্ছে। কৃত্রিম মেধা সচল রাখতে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ও অর্থের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে শত শত কোটি ডলার লগ্নি এবং বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়া হচ্ছে। ডেটা সেন্টারের শক্তিশালী সার্ভারগুলো কার্যকরভাবে ঠান্ডা রাখতে ব্যবহার হচ্ছে বিপুল প্রাকৃতিক পানি। যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়ার কাউন্সিল ব্লাফসের একটি ডেটা সেন্টারে কেবল ২০২৪ সালেই ১০০ কোটি গ্যালনের বেশি পানি ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে।

ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা নিয়েও নিরাপত্তাঝুঁকি দিন দিন প্রকট হচ্ছে। চ্যাটবট বা এআই এজেন্টকে ব্যবহারকারীরা অনেক সময় ই-মেইল, ব্যক্তিগত নথি ও ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের উন্মুক্ত অনুমোদন দিয়ে থাকেন। এমন অসাবধানতার সুযোগে গুরুত্বপূর্ণ ফাইল মুছে যাওয়া কিংবা ব্যবহারকারীর আর্থিক ক্ষতির নজিরও তৈরি হয়েছে। নিউরাল নেটওয়ার্কের জটিল বিন্যাসের মাধ্যমে প্রচুর ডিজিটাল তথ্য ঘেঁটে উত্তর তৈরি করলেও এআই সম্পূর্ণ নির্ভুল নয়। নিজের ভুলকে সত্য আকারে তুলে ধরার যে ভ্রান্তি বা হ্যালুসিনেশন তৈরি হয়, তাতে এই প্রযুক্তির সিদ্ধান্তকে অন্ধভাবে নির্ভুল ভাবার সুযোগ নেই।