এপ্রিল ১৮, ২০২৬, ১০:১৪ এএম
বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত বর্তমানে চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। গত বৃহস্পতিবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত বিখ্যাত নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান আটলান্টিক সেন্টার আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে তিনি এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন।
আটলান্টিক সেন্টারের সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এই আলোচনায় অর্থমন্ত্রী বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেন।
বক্তব্যের শুরুতেই আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া অর্থনীতির করুণ চিত্র তুলে ধরে বলেন যে, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করার পর আর্থিক খাতের যে গভীর সংকট দেখতে পেয়েছে তা রীতিমতো আলোচনার দাবি রাখে। তার ভাষ্যমতে, দেশের ব্যাংকিং খাত এখন অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় রয়েছে এবং অনেক ব্যাংক কার্যত দেউলিয়া হওয়ার পথে।
পুঁজিবাজারও দীর্ঘ সময় ধরে স্থবির হয়ে আছে। এর চেয়েও বড় আশঙ্কার বিষয় হলো, বিগত সময়ে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ফলে বর্তমানে অভ্যন্তরীণ বাজারে তীব্র পুঁজিসংকট তৈরি হয়েছে এবং মূলধনের বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।অর্থমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঐতিহাসিকভাবেই বেসরকারি খাতনির্ভর ছিল। অতীতে সব অর্থনৈতিক কৌশল এই খাতকে কেন্দ্র করেই সাজানো হতো।
তবে বর্তমানে সেই বেসরকারি খাতকে খাদের কিনারা থেকে উদ্ধার করাই সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি জানান, অনেক ব্যাংকের মূলধন কাঠামো ভেঙে পড়েছে, যে কারণে এসব প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত পুনঃপুঁজিকরণ বা রিক্যাপিটালাইজেশন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এই সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু না হলে অর্থনীতির চাকা সচল করা সম্ভব হবে না।বেসরকারি খাতের এই পুঁজিসংকটের পেছনের কারণগুলো ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আমির খসরু বলেন, অতীতে দেশের অর্থনীতি অনেকটা অলিগার্কিক বা বিশেষ গোষ্ঠীনির্ভর হয়ে পড়েছিল।
এর ফলে সাধারণ ও প্রকৃত ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতামূলক বাজারে কাজ করার সমান সুযোগ পাননি। এছাড়া টাকার মান প্রায় ৪০ শতাংশ অবমূল্যায়ন এবং অতিরিক্ত ১০ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতির কারণে ব্যবসায়ীদের কার্যকরী মূলধনের প্রায় অর্ধেকই হারিয়ে গেছে। এই ব্যাপক পুঁজি ক্ষয়ের কারণে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ক্ষমতা নাটকীয়ভাবে কমে বর্তমানে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশে নেমে এসেছে। কম উৎপাদনের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো ধারাবাহিকভাবে লোকসান গুনছে এবং তাদের অবশিষ্ট মূলধনও দিন দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে।
দেশের এই নাজুক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কামনা করেছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনায় সরকার বেসরকারি খাত ও ব্যাংকিং খাতের পুঁজি ঘাটতি পূরণ করাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তার মতে, পুঁজি পুনরুদ্ধার না হলে অন্য কোনো বড় ধরনের সংস্কার কার্যক্রম সফল হবে না। বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য আগামী দুই বছরের জন্য একটি টেকসই আর্থিক সহায়তার প্যাকেজ অত্যন্ত জরুরি, যার মাধ্যমে বেসরকারি খাতে প্রাণের সঞ্চার করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও জানান, কর-জিডিপি অনুপাত যা আগে ১১ শতাংশ ছিল, তা এখন ৭ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। ব্যবসায়ীরা ঘুরে না দাঁড়ালে কর আদায় বাড়ানো সম্ভব নয়, তাই আগে উৎপাদন খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে।অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানির বিষয়ে মাইকেল কুগেলম্যানের এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র অবশেষে এই বিষয়ে ছাড় দিয়েছে। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় স্বস্তির খবর, কারণ স্পট মার্কেটের তুলনায় রাশিয়ার তেল তুলনামূলক সস্তা। এতে সরকারের আমদানি খরচ অনেকটাই কমবে।
এছাড়া জ্বালানি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও গভীর সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা চলছে এবং এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব ইতিমধ্যে মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। চুক্তিটি সম্পন্ন হলে এই খাতে বড় ধরনের অগ্রগতির আশা করছেন অর্থমন্ত্রী। এদিকে একই দিনে অর্থমন্ত্রী মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি পল কাপুরের সঙ্গেও বৈঠক করেন, যেখানে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে।



দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন