রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

অচল দুর্নীতি দমন কমিশন: সচল হয়রানি

জাতীয় ডেস্ক

মে ২১, ২০২৬, ১০:২৬ এএম

অচল দুর্নীতি দমন কমিশন: সচল হয়রানি

অচল দুর্নীতি দমন কমিশন

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এখন কার্যত অচল। গত তিন মার্চ কমিশনের চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার পদত্যাগের পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে আছে। দুদকের আইন অনুযায়ী, প্রতিটি অনুসন্ধানের অনুমোদন থেকে শুরু করে চার্জশিট দাখিল পর্যন্ত সব কার্যক্রমে কমিশনের স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক। নেতৃত্বশূন্যতার কারণে এখন সেই অনুমোদন প্রক্রিয়া পুরোপুরি থমকে গেছে।

দুদক এখন অচল, তবে ভুক্তভোগীদের হয়রানি থেমে নেই।ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বিগত সরকার বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ঢালাওভাবে অর্থ পাচারের অভিযোগ আনে। তথাকথিত এই অভিযোগের ভিত্তিতে ৫৭ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দ ও অনেকের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। 

অথচ এক বছরের বেশি সময় ধরে তদন্ত নাটকের পর দেখা গেছে, ১১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পাঁচটির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগেরই ভিত্তি নেই। বাকি ছয়টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।অভিযোগ থেকে মুক্তি পেলেও জব্দ হওয়া অ্যাকাউন্ট এখনো খোলা হয়নি।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, জব্দকৃত অ্যাকাউন্টের ৯০ শতাংশই অনুসন্ধানে ক্লিন পাওয়া গেছে। কিন্তু কমিশন না থাকায় এসব নথি নিষ্পত্তি বা অ্যাকাউন্ট খুলে দেওয়ার কোনো আইনি সুযোগ নেই। ৩ শতাধিক ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি বিনা অপরাধে সাজা ভোগ করছেন। তাদের বিদেশ ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞাও প্রত্যাহার হয়নি। তাদের এই ক্ষতির দায়ভার নেওয়ার মতো কেউ নেই।দুদক আইনের ১৭ ধারা অনুযায়ী কমিশনের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক।

পদত্যাগকারী চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেন এবং দুই কমিশনার পদত্যাগের পর তিন মাস পার হলেও সার্চ কমিটি গঠন করা হয়নি। আইন অনুযায়ী ৩০ দিনের মধ্যে কমিশন নিয়োগের বাধ্যবাধকতা থাকলেও সরকার তা পালন করেনি। ফলে নিয়মিত প্রশাসনিক কাজের বাইরে দুদকের মূল ম্যান্ডেট সংক্রান্ত সব কাজ বাস্তবে বন্ধ। বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো নতুন মামলা দায়ের বা চার্জশিট অনুমোদন অসম্ভব হয়ে পড়েছে।আইনি জটিলতায় কর্মকর্তাদের অনুসন্ধানেও দেখা দিয়েছে চরম স্থবিরতা।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান একে নজিরবিহীন বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, দুর্নীতি দমন কমিশনের এমন অকার্যকারিতা সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের ওপর প্রশ্ন তুলছে। তিনি জানান, ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এমন দীর্ঘমেয়াদী নেতৃত্বশূন্যতা আগে কখনো দেখা যায়নি। এটি সাধারণ মানুষের মাঝে আস্থার সংকট তৈরি করছে।সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বেশ কিছু অধ্যাদেশ পাস হলেও দুদকের বিষয়ে সিদ্ধান্ত ঝুলে আছে।

গত ১২ মার্চ সংসদ অধিবেশনে উত্থাপিত ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ১১৩টি পাস হলেও বাকিগুলো কার্যকারিতা হারিয়েছে। আইন অনুযায়ী এখন দুদক আইন-২০০৪ পূর্ণাঙ্গভাবে বহাল রয়েছে। সেই আইনের শর্তানুযায়ী সার্চ কমিটি গঠনের কথা থাকলেও তা এখনো অদৃশ্য। সরকারের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, শিগগিরই সার্চ কমিটি গঠন করা হতে পারে।এই অনিশ্চয়তা কেবল ভুক্তভোগীদের কষ্টই বাড়াচ্ছে না, দুর্নীতিবাজদের জন্য তৈরি করছে সহায়ক পরিবেশ।

কমিশন না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কর্মকর্তারা পুরোনো অনুসন্ধান ও তদন্তের নথি নিয়ে বসে থাকলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছেন না। এই আইনি শূন্যতায় একদিকে যেমন নিরীহ মানুষ সীমাহীন হয়রানির শিকার হচ্ছেন, অন্যদিকে সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযান কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে।যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় দ্রুত নতুন কমিশন গঠনের দাবি জোরালো হচ্ছে।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো ধরনের তদন্ত ছাড়া সম্পদ জব্দ করা বা কাউকে সাজা দেওয়া সংবিধানের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। অন্তর্বর্তী সরকার যে স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা ব্যবহার করে এসব পদক্ষেপ নিয়েছিল, তা এখন সরকারের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান সরকারের জন্য এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো এই আইনি শূন্যতা কাটিয়ে জনআস্থা ফিরিয়ে আনা।