শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ইতিহাস

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৭০ বছরের দাদির বিশ্বরেকর্ড

স্পোর্টস ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৬, ০৯:২০ পিএম

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৭০ বছরের দাদির বিশ্বরেকর্ড

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের আঙিনায় তৈরি হলো রূপকথার মতো এক অভাবনীয় উপাখ্যান। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ চিলির ইভন ভিলডোসোলা ২০১৯ সালে উনসত্তর বছর বয়সে জীবনে প্রথমবারের মতো ব্যাট হাতে তুলে নিয়েছিলেন। চলতি ২০২৬ সালের এপ্রিলে সত্তর বছর বয়সে আন্তর্জাতিক মঞ্চে অভিষেক ঘটিয়ে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক সক্রিয় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। বিস্ময়কর বিষয় হলো, যে দলের হয়ে তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রেখেছেন, সেই জাতীয় নারী দলের অধিনায়ক তার নিজের নাতনি তেইশ বছর বয়সী ক্যামিলা ওয়ার্স। বয়স কেবল একটি সংখ্যা মাত্র।

এই রূপকথার ভিত্তি রচিত হয়েছিল সাত বছর আগে। স্থানীয় পাখি লাস লেইকাসের নামে পরিচিত চিলি নারী ক্রিকেট দল নুবলে অঞ্চলে তৎকালীন অধিনায়ক জ্যানেট গার্সেসের নেতৃত্বে মা ও মেয়েদের ক্রিকেট উৎসবের উদ্যোগ নিয়েছিল। সেই সময় ষোলো বছর বয়সী ওয়ার্স তার দাদিকে সঙ্গে মাঠে যাওয়ার জন্য রাজি করান। ওয়ার্স নিজে প্রথম ক্রিকেটে এসেছিলেন ২০১০ সালে মাত্র আট বছর বয়সে, তার শিক্ষক ও জাতীয় দলের খেলোয়াড় আলেজান্দ্রা জুনিগার অনুপ্রেরণায়। ভিলডোসোলা জানান, তিনি ভেবেছিলেন ওই উৎসবে নাতনির বন্ধুদের জন্য রান্না করাই তার মূল কাজ হবে; তবে সেখানে গিয়েই তিনি প্রথমবার খেলার ব্যাট স্পর্শ করেন।

ধীরে ধীরে খেলার প্রতি তার গভীর অনুরাগ জন্মায়, যেখানে মেয়ে লরেটো ও নাতনি ওয়ার্স তাকে অবিরাম উৎসাহ জুগিয়েছেন। আনন্দঘন পারিবারিক সেই আয়োজন শেষ পর্যন্ত তাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিয়ে যায়। চলতি বছরের এপ্রিলে কোস্টারিকার বিপক্ষে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচে নাতনি ওয়ার্সের সঙ্গে ওপেনিং ব্যাটার হিসেবে মাঠে নামেন ভিলডোসোলা। এর মাধ্যমে তিনি ১৯৫০-৫১ মৌসুমে ৭২ বছর বয়সে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক ঘটা রাজা মহারাজ সিংয়ের পর পেশাদার ক্রিকেটের ইতিহাসে দ্বিতীয় বয়স্ক খেলোয়াড় হিসেবে রেকর্ড বইয়ে নাম লেখান।

শারীরিক সুস্থতার জন্য ক্রিকেট তার জীবনে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছে। অতীতে কখনো পেশাদার ক্রীড়াবিদ না হলেও অপেশাদার হিসেবে তিনি শরীরচর্চামূলক খেলায় যুক্ত ছিলেন। এখন পর্যন্ত খেলা দুটি আন্তর্জাতিক ম্যাচের দুটিতেই তিনি শূন্য রানে আউট হলেও তার কাছে মুখ্য বিষয় কেবল মাঠে অংশ নেওয়া। তিনি জানান, যৌবনে চারদিকে বাস্কেটবল, ভলিবল ও ফুটবলের চল থাকলেও ক্রিকেটের নাম তিনি শোনেননি; তবে লাতিন আমেরিকার সক্রিয় জীবনধারার অংশ হিসেবে খেলায় অংশগ্রহণই তার পরম আনন্দ।

নাতনি ওয়ার্সের কাছেও দাদির এই অন্তর্ভুক্তি ছিল সম্পূর্ণ অভাবনীয়। তিনি জানান, দাদিকে সবসময় চঞ্চল ও সক্রিয় দেখলেও তিনি কখনো ভাবেননি যে দুজনে একসাথে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চড়াবেন। জয়েন্টের সমস্যার কারণে বোলিং করতে না পারলেও সোজা ব্যাটে শট খেলতে দারুণ ভালোবাসেন ভিলডোসোলা। সতীর্থদের চেয়ে প্রায় পঞ্চাশ বছরের বড় হওয়া সত্ত্বেও তিনি মাঠে নাতনির নেতৃত্বে খেলতে পেরে গভীর গর্ব ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। অধিনায়ক নাতনিও জানান, ঘরের মানুষকে মাঠে কৌশলগত আদেশ দেওয়া কিছুটা অস্বস্তিকর হলেও অভিজ্ঞতাটি তাদের দুজনের কাছেই অত্যন্ত আনন্দের।

চিলিতে ক্রিকেটের এই বিকাশ সম্ভব হয়েছে মূলত প্রবাসীদের হাত ধরে। দেশটির ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি প্যাট্রিসিও কামানিও ভিভেরোস পঁচিশ বছর আগে এক অস্ট্রেলীয় কর্মকর্তার মাধ্যমে এই খেলার প্রেমে পড়েন। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে মাঠের সংকট ও ফুটবল মাঠের চড়া ভাড়ার কারণে তারা বিনিয়া দেল মার সমুদ্র সৈকতে বিচ ক্রিকেট চালু করেন। প্রথম বছরে মাত্র পঞ্চাশ জন নিয়ে শুরু হওয়া সেই সৈকত টুর্নামেন্টে এখন প্রায় পাঁচশত মানুষ পরিবারসহ অংশ নেন। ব্রিটেন ও ভারত থেকে বন্ধুদের মাধ্যমে আনা ব্যাট-বল দিয়ে চলা এই খেলায় এলবিডব্লিউ না থাকা কিংবা শুধু বোলার প্রান্তে রান আউটের মতো সহজ নিয়ম রাখা হয়েছে।

অন্তর্ভুক্তিমূলক এই পরিবেশের কারণেই চিলির নারী ক্রিকেট দল ২০২০ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের বিশেষ স্বীকৃতি লাভ করে। প্লাস্টিকের ব্যাট ও টেনিস বল দিয়ে শুরু করে ধাপে ধাপে ভিলডোসোলাকে মূলধারার ক্রিকেটে আনা হয়। দলীয় সদস্যদের একতাবদ্ধ মানসিকতা তাদের মূল শক্তি হলেও পুরো মহাদেশে ক্রিকেটের প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে স্প্যানিশ ও ইংরেজি ভাষার জটিলতা। নিয়মকানুন ও সরঞ্জামের ইংরেজি নামগুলো স্থানীয় মানুষের জন্য অপরিচিত হলেও প্রতিবেশি ব্রাজিলের নারী ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমান সভাপতি রবার্টা মোরেত্তি অ্যাভেরির নেতৃত্ব চিলির ক্রিকেটকে প্রতিনিয়ত স্বপ্ন দেখাচ্ছে।