বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,
শব্দদূষণহীন আধুনিক উদ্যান

শব্দরোধক কাচে গুলশানের শহীদ ডা. ফজলে রাব্বি পার্ক

জাতীয় ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬, ১২:৫৪ পিএম

শব্দরোধক কাচে গুলশানের শহীদ ডা. ফজলে রাব্বি পার্ক

রাজধানীর ব্যস্ত গুলশান এলাকার কোলাহলের ভেতর সবুজ আর নির্মল শান্তির এক ব্যতিক্রমী পরিবেশ তৈরি করেছে শহীদ ডা. ফজলে রাব্বি পার্ক। জার্মানির অত্যাধুনিক শব্দরোধক প্রযুক্তির স্বচ্ছ দেওয়াল ব্যবহার করে ঢাকার অভিজাত এই এলাকায় প্রায় ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে পার্কটি আধুনিকায়ন করা হয়েছে। শব্দদূষণের মাত্রা সহনীয় পর্যায়ে রাখা দেশের প্রথম এই ইকোপার্কটি সংস্কারের পেছনে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ব্যয় হয়েছে ১২ কোটি ৭১ লাখ টাকা। দীর্ঘ সংস্কার প্রক্রিয়া শেষে ২০২৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি পার্কটি সাধারণ নগরবাসীর জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। পার্কের চারপাশ দিয়ে ব্যস্ত সড়কে শত শত গাড়ি চলাচল করলেও শব্দরোধক সীমানাপ্রাচীর থাকায় ভেতরে শব্দের তীব্রতা বাইরের চেয়ে অন্তত ৫০ শতাংশ কম থাকে।

ব্যস্ত মহানগরে সবুজ আর অদ্ভুত নীরবতার এক দুর্লভ আশ্রয়স্থল। সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী পার্ক এলাকা নীরব অঞ্চল হিসেবে গণ্য হলেও অতীতে এই উদ্যানে শব্দের গড় মাত্রা ছিল প্রায় ৭৫ ডেসিবেল, যা কখনো কখনো ৮৬ ডেসিবেলে পৌঁছে যেত। সরকারের বিদ্যমান শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা ২০০৬ অনুসারে দিনে ও রাতে এই ধরনের এলাকায় শব্দমাত্রা হওয়া উচিত যথাক্রমে সর্বোচ্চ ৫০ ও ৪০ ডেসিবেল। পার্কে আশ্রয় নেওয়া নানা প্রজাতির পাখি, ছোট জীবজন্তু ও পোকামাকড়ের স্বাভাবিক জীবন নিশ্চিত করতে স্বচ্ছ শব্দরোধক সীমানা ব্যবহারের পদক্ষেপ নেয় সিটি করপোরেশন। গুলশান এক নম্বরের পুলিশ প্লাজার ঠিক বিপরীত পাশে অবস্থিত এই পার্কের উত্তর পাশের মূল ফটকটি ইংরেজি বর্ণ এসের আদলে তৈরি করা হয়েছে, যাতে প্রবেশপথ দিয়েও বাইরের উচ্চ শব্দ সরাসরি ভেতরে ঢুকতে না পারে।

উদ্যানে ব্যবহৃত স্বচ্ছ শব্দরোধক সাধারণ কোনো কাচ নয়, বরং উচ্চমানের এক্সট্রুডেড অ্যাক্রেলিক উপাদান। শহীদ ডা ফজলে রাব্বি পার্কজার্মানিতে তৈরি বিশেষ এই স্বচ্ছ দেওয়াল পরিবেশ সংক্রান্ত যাবতীয় বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড পূরণ করে স্থাপন করা হয়েছে। কাচের গায়ে নির্দিষ্ট দূরত্বে অনুভূমিক রেখা আঁকা রয়েছে, যা বার্ড সেফটি স্ট্রিপ নামে পরিচিত; এর ফলে দ্রুত উড়ন্ত পাখি কাচে ধাক্কা খাওয়া থেকে রক্ষা পায়। পুরো পার্ক এলাকাটিতে কোনো গাছ না কেটে বরং গাছ বাঁচিয়ে আঁকাবাঁকা দৃষ্টিনন্দন হাঁটাপথ তৈরি করা হয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের কৃত্রিম জলাশয়ের ওপর বসানো হয়েছে নান্দনিক স্টিলের সেতু। দক্ষিণ অংশে মাটির প্রায় একশ ফুট উঁচু সবুজ টিলা তৈরি করা হয়েছে, যার ওপরে ওঠার জন্য রয়েছে চমৎকার সিঁড়ি।

শহীদ ডা. ফজলে রাব্বি ছিলেন বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শহীদ বুদ্ধিজীবী ও বিশ্বখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় ১৯৭১ সালে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের গোপনে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ সরবরাহ করতেন। ১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর আলবদর ও পাকিস্তানি বাহিনীর সদস্যরা তাকে কর্মস্থল থেকে অপহরণ করে নিয়ে যায় এবং পরবর্তীতে রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার আত্মত্যাগের স্মৃতি অম্লান রাখতেই এই পার্কের নামকরণ করা হয়েছে।

পার্কে পর্যাপ্ত উন্মুক্ত চত্বর, ড্রপ অফ জোন, সাইকেল পার্কিং, আধুনিক লাইটিং, বসার বেঞ্চ, স্বয়ংক্রিয় স্প্রিঙ্কলার, সার্ভিস ব্লক, গ্রিন ওয়াল, শিশুদের খেলার চত্বর এবং ড্রেনেজ সমৃদ্ধ রেইন গার্ডেন রাখা হয়েছে। প্রতিদিন সকাল ছয়টা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত জনসাধারণের জন্য খোলা থাকা এই উদ্যানে আম, জাম, কলা, তাল, খেজুর, নারিকেল, আমলকী ও পেয়ারাসহ বহু দেশীয় ফলের গাছ রয়েছে। পার্কটি রক্ষণাবেক্ষণের মূল দায়িত্ব পালন করছে গুলশান সোসাইটি, যেখানে আটজন পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তাকর্মী সার্বক্ষণিক তদারকি করছেন। সোসাইটির সভাপতি ওমর সাদাত জানিয়েছেন, দৃষ্টিনন্দন এই স্বচ্ছ নয়েজ ব্যারিয়ারের কারণে পার্কের ভেতর বাইরের চেয়ে অর্ধেক শব্দ অনুভূত হয় এবং বড় কোনো সংস্কার প্রয়োজন হলে সিটি করপোরেশন দ্রুত তা সম্পন্ন করে।