বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

মুসোলিনি থেকে মেসি: FIFA World Cup-এর অন্ধকার ইতিহাস

স্পোর্টস ডেস্ক

জুন ১৯, ২০২৬, ১০:৪৭ পিএম

মুসোলিনি থেকে মেসি: FIFA World Cup-এর অন্ধকার ইতিহাস

একটি গোলক আকৃতির বলকে কেন্দ্র করে পুরো পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের যে উন্মাদনা তা কেবল মাঠের সবুজ ঘাসেই সীমাবদ্ধ থাকে না। মাঠের সেই আনন্দ ও গোল উদযাপনের আড়ালে অনেক সময় ঢাকা পড়ে যায় নির্মম রাজনৈতিক নিষ্ঠুরতা, স্বৈরশাসকদের রক্তচক্ষু আর হাজারো শ্রমিকের নীরব দীর্ঘশ্বাস। প্রথম আসর থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত ফিফা বিশ্বকাপের অন্ধকার ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এটি কেবল একটি খেলাই ছিল না। 

ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁকে এই মহান মঞ্চটিকে ব্যবহার করা হয়েছে ক্ষমতার দম্ভ প্রচার ও নিপীড়নকে আড়াল করার হাতিয়ার হিসেবে।ফুটবল শুধু জীবনের অংশ নয় তা শোষণেরও গল্প।গত ১৯৩০ সালের প্রথম আসরে বিশ্ব যখন চরম অর্থনৈতিক মন্দায় নিমজ্জিত তখন দক্ষিণ আমেরিকার ছোট দেশ উরুগুয়ে স্বাধীনতার শতবর্ষ উদযাপনে বিশাল স্টেডিয়াম নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। দিনরাত কাজ করে শ্রমিকেরা টুর্নামেন্ট শুরুর মাত্র পাঁচ দিন পর নির্মাণ কাজ শেষ করলেও ইউরোপের অধিকাংশ বড় দল অহংকার আর দূরত্বের অজুহাতে সেই উৎসবে যোগ দেয়নি। 

যারা আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে এসেছিল তাদের যাত্রা ছিল এক দীর্ঘ সমুদ্র অভিযান যেখানে জাহাজের ডেকেই চলত অনুশীলন। রোমানিয়ার তৎকালীন রাজা নিজেই দল নির্বাচন করেছিলেন কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন ফুটবল কোনো সাধারণ বিনোদন নয় বরং এটি রাষ্ট্রের মর্যাদার লড়াই।চার বছর পর ১৯৩৪ সালে ইতালির স্বৈরশাসক বেনিতো মুসোলিনি ফুটবলকে তারসৈন্যতান্ত্রিক আদর্শ প্রচারের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেন। তিনি স্টেডিয়ামকে এমন এক শূন্য সিংহাসন হিসেবে দেখতেন যেখানে অনায়াসে নিজেকে ঈশ্বরের আসনে বসিয়ে দেওয়া যায়। 

রোমের প্রতিটি দেয়ালে তার নিজস্ব পোস্টার সাঁটানো হয়েছিল এবং টিকেটের গায়ে ছিল ফ্যাসিস্টদের বিশেষ প্রতীক। ম্যাচ জয়ের জন্য খেলোয়াড়দের প্রতি ইতালীয় স্বৈরশাসকের সরাসরি নির্দেশ ছিল হয় জিতে এসো নয়তো মরে এসো।সেমিফাইনালে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে ইতালির বিতর্কিত জয়ের আগের রাতে সুইডিশ রেফারি স্বয়ং মুসোলিনির সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন যার পরদিন মাঠের দুটি নিশ্চিত গোল বাতিল করা হয়। এরপর ১৯৩৮ সালের আসরের ঠিক আগে অ্যাডলফ হিটলার অস্ট্রিয়া দখল করে নিলে মানচিত্র থেকে একটি দেশের অস্তিত্ব মুছে যায়। 

অস্ট্রিয়ার তারকা খেলোয়াড় মাটিয়াস সিন্ডেলার নাৎসিদের জার্সি পরতে সরাসরি অস্বীকার করায় তাকে পরবর্তীতে নিজের ফ্ল্যাটে রহস্যজনক অবস্থায় মৃত পাওয়া যায়। ইতালীয় দল সেবার ফ্রান্সের মাঠে নীল জার্সির পরিবর্তে ফ্যাসিস্টদের কালো পোশাক পরে খেলতে নেমেছিল এবং গ্যালারির দুয়োকে উপেক্ষা করে শূন্যে হাত তুলে ফ্যাসিবাদের অভিবাদন জানিয়েছিল। ফাইনালে হাঙ্গেরির গোলরক্ষক ম্যাচ হেরে মন্তব্য করেছিলেন যে তিনি ম্যাচ হারলেও এগারোটি মানুষের জীবন বাঁচাতে পেরেছেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ থাবায় ছয় কোটি মানুষের প্রাণহানির কারণে পরবর্তী দুটি আসর বাতিল হয়ে যায় এবং গোলপোস্টের জায়গা দখল করে নেয় বিমান বিধ্বংসী কামান। যুদ্ধ শেষে ১৯৫০ সালে ব্রাজিলের মারাকানা স্টেডিয়ামে দুই লাখের বেশি দর্শকের সামনে উরুগুয়ের কাছে স্বাগতিকদের অবিশ্বাস্য পরাজয় এক জাতীয় ট্র্যাজেডিতে রূপ নেয়। ম্যাচ হেরে গ্যালারিতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে এবং পরবর্তীতে দেশজুড়ে ছাদ থেকে লাফ দিয়ে ও আত্মহত্যার মাধ্যমে বহু মানুষ প্রাণ হারান।সেই এক গোলের দায়ে ব্রাজিলের কালো গোলরক্ষক মোয়াসির বারবোসাকে আজীবন অপয়া ও অভিশপ্ত হিসেবে বেঁচে থাকতে হয়েছিল।

গত ১৯৫৪ সালে সুইজারল্যান্ডের বার্নে পশ্চিম জার্মানি অপরাজিত হাঙ্গেরিকে হারিয়ে জয়ী হলেও পরবর্তীতে জানা যায় জার্মান খেলোয়াড়দের নাৎসি সেনাদের ব্যবহৃত এক ধরনের বিশেষ উদ্দীপক ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল। এরপর ১৯৬২ সালে ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পে চিলি বিধ্বস্ত হওয়ার পরও তারা সবকিছু বাজি রেখে টুর্নামেন্ট আয়োজন করে। সেবার ব্রাজিলের বাঁকা পায়ের জাদুকর গারিঞ্চা পুরো বিশ্বকে আনন্দ দিলেও তার নিজের শেষ জীবন কেটেছিল চরম দারিদ্র্য ও মদের নেশায় বুঁদ হয়ে। ১৯৬৬ সালে উত্তর কোরিয়ার কমিউনিস্ট দলটি ইতালিকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লেও পরবর্তীতে নিয়ম ভঙ্গের অপরাধে তাদের অনেক খেলোয়াড়কে খনিতে কঠোর  পাঠানো হয়েছিল। 

একই আসরে লন্ডনে ট্রফি চুরির ঘটনা ঘটলেও পিকলস নামের একটি সাধারণ কুকুর সেটি উদ্ধার করে রাতারাতি জাতীয় নায়ক বনে যায়।গত ১৯৬৯ সালে হন্ডুরাস ও এলসালভেডরের মধ্যকার বাছাই পর্বের ম্যাচকে কেন্দ্র করে দুটি প্রতিবেশী দেশের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হয় যাতে প্রায় তিন হাজার মানুষ মারা যান। ফুটবল কখনো কখনো পুরনো সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষোভের নতুন প্রকাশ ঘটিয়ে মানুষকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। ১৯৭৪ সালে টোটাল ফুটবলের জনক ইয়োহান ক্রুয়েফ তার দর্শনের মাধ্যমে মাঠ মাতালেও ফাইনালে জার্মানির কাছে হেরে যান। তিনি মনে করতেন কাপ জেতার চেয়ে কীভাবে খেলা হয়েছিল তা মানুষের মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।

ইতিহাসের সবচেয়ে কুখ্যাত রাজনৈতিক স্পোর্টসওয়াশিং বা খেলাধুলার মাধ্যমে অপরাধ আড়ালের ঘটনা ঘটেছিল ১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে। স্বৈরশাসক হোর্হে রাফায়েল ভিদেলার সামরিক জান্তা সরকার তখন দেশের প্রায় ৩০ হাজার ছাত্র, শিক্ষক ও সাংবাদিককে গুম করে দিয়েছিল। ফুটবল মাঠের মাত্র ১ হাজার ১০০ মিটার দূরে অবস্থিত নৌবাহিনীর একটি স্কুলকে রূপান্তরিত করা হয়েছিল দেশের সবচেয়ে বড় গোপন নির্যাতন কেন্দ্রে। স্টেডিয়ামের গ্যালারি যখন গোলের চিৎকারে ফেটে পড়ত তখন সেই বেজমেন্টের বন্দিরা বাইরে মানুষের উল্লাসের শব্দ শুনতে পেতেন।

বন্দি গর্ভবতী নারীদের সন্তান প্রসবের পর তাদের জীবন্ত অবস্থায় হাত পা বেঁধে হেলিকপ্টার থেকে আটলান্টিক মহাসাগরে ফেলে দেওয়া হতো। স্বৈরশাসক ভিদেলা যখন ভিআইপি বক্সে বসে ট্রফি জয়ের উল্লাস করছিলেন তখন মানুষের অদৃশ্য হওয়ার সেই ট্র্যাজেডি আড়াল হয়ে গিয়েছিল ফুটবলের নীল সাদা পতাকার নিচে। পরবর্তীতে ১৯৮২ সালে স্পেনের গিজনের মাঠে পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার মধ্যকার পূর্বপরিকল্পিত পাতানো ম্যাচ আলজেরিয়াকে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে দেয়। ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অপরাধে জেল খেটে আসা পাওলো রসি একই আসরে ইতালির হয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার জিতে নেন। ফুটবল মাঠের এই অনিয়ম ও উদাসীনতা খেলার নিজস্ব আত্মাকে কলঙ্কিত করেছিল।

গত ১৯৮৬ সালে ফকল্যান্ড যুদ্ধের পটভূমিতে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হয়ে ডিয়েগো ম্যারাডোনা তার বিখ্যাত ঈশ্বরের হাত এবং শতাব্দীর সেরা গোলের মাধ্যমে এক ঐতিহাসিক প্রতিশোধ নেন। আর্জেন্টিনার সেই ১৮ থেকে ১৯ বছরের তরুণ সৈন্যদের মৃত্যুর প্রতিশোধ ম্যারাডোনা তার পায়ের জাদুতে নিয়েছিলেন যা তাকে দরিদ্র মানুষের এক অনন্য মুখপাত্রে পরিণত করেছিল। ১৯৯০ সালে নিজের শহর নেপোলিতে ইতালির বিরুদ্ধে সেমিফাইনালে জয়লাভ করার পর ইতালীয় সমাজ ম্যারাডোনাকে আর ক্ষমা করেনি। কোকেইন কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে ১৫ মাসের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে তাকে চিরতরে সেই দেশ ছাড়তে হয়েছিল।

গত ১৯৯৪ সালে আমেরিকার প্রখর গরমে দুপুরের দিকে ম্যাচ আয়োজন করায় মাঠের তাপমাত্রা ৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায় এবং অনেক খেলোয়াড় মাঠেই অসুস্থ হয়ে করতে থাকেন। আমেরিকার বিশাল টেলিভিশন বাজারের প্রাইম টাইম ধরার জন্য খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্যকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ফিফা বাণিজ্যিক মুনাফাকেই প্রাধান্য দিয়েছিল। সেই আসরে আমেরিকার বিরুদ্ধে আত্মঘাতী গোল করার অপরাধে কলম্বিয়ার তরুণ ডিফেন্ডার আন্দ্রেস এসকোবারকে দেশে ফেরার মাত্র ১০ দিন পর মাদক চক্রের গুলিতে নির্মমভাবে প্রাণ হারাতে হয়।ফুটবল মাঠে অতিরিক্ত সময় থাকলেও তরুণের বাস্তব জীবনে আর কোনো অতিরিক্ত সময় ছিল না।

গত ২০০২ সালে সেনেগাল তাদের সাবেক ঔপনিবেশিক শাসক ফ্রান্সকে উদ্বোধনী ম্যাচে হারিয়ে তাদের পূর্বপুরুষদের দীর্ঘ দাসত্বের এক প্রতীকী ঋণ শোধ করে। ২০০৬ সালের বিশ্বকাপের মূল গোলরক্ষকের ব্যাকআপ রবার্ট এনকে তার দুই বছরের কন্যাসন্তানের মৃত্যুর পর তীব্র বিষণ্ণতায় ভুগে ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিয়ে নিজের জীবন বিসর্জন দেন। ফাইনালে জিনেদিন জিদানের সেই বিখ্যাত মাথা দিয়ে ঢুস মারার ঘটনাটি ছিল তার নিজের সম্মান রক্ষার এক আপসহীন প্রতীক। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদ পরবর্তী আসরে স্টেডিয়াম নির্মাণের জন্য ৪ বিলিয়ন ডলার খরচ করা হলেও বস্তির দরিদ্র মানুষের মৌলিক অধিকার সম্পূর্ণ উপেক্ষিত থেকে যায়। ফুটবল উৎসব শেষ হওয়ার পর সেই বিশাল স্টেডিয়ামগুলো আজ এক একটি পরিত্যক্ত কঙ্কাল হিসেবে পড়ে আছে।

গত ২০১৪ সালে ব্রাজিলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের টাকা কেটে স্টেডিয়াম বানানোয় দেশজুড়ে তীব্র দাঙ্গা ও গ্রাফিতির মাধ্যমে বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়। এরপর ২০১৮ সালে রাশিয়ার আসরে পুতিনের l দম্ভের আড়ালে যুদ্ধবিধ্বস্ত লুকা মদ্রিচের শৈশবের শরণার্থী শিবিরের ছেঁড়া বলের গল্প আলো ছড়ায়। ২০২২ সালের কাতারের মরুভূমিতে তেলের টাকায় আয়োজিত আসরটি ছিল আধুনিক দাসত্বের এক নিকৃষ্টতম উদাহরণ। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও নেপালের মতো দরিদ্র দেশগুলো থেকে যাওয়া অন্তত ৬ হাজার ৫০০ অভিবাষী শ্রমিক ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় কাজ করতে গিয়ে নির্মমভাবে মারা যান। পুঁজিবাদী কাতার সরকার এবং ফিফা সেই রক্তের দাগকে জমকালো আলো ও ফুটবলের জাদুকরী ট্রফি দিয়ে অদৃশ্য করে দিলেও ইতিহাসের পাতায় তা চিরকাল এক কালো অধ্যায় হিসেবে খোদাই করা থাকবে।