জুন ২১, ২০২৬, ০৯:৪০ পিএম
১১ বছর বয়সে গ্রোথ হরমোন ডেফিশিয়েন্সি বা শারীরিক বৃদ্ধির সমস্যা ধরা পড়েছিল এক শিশুর। সেই চিকিৎসা সম্পন্ন করার জন্য প্রতি মাসে প্রয়োজন হতো প্রায় ৯০০ ডলার। একটি সাধারণ দরিদ্র পরিবারের পক্ষে এই বিপুল অর্থ বহন করা ছিল অত্যন্ত কঠিন। শিশুটি চমৎকার ফুটবল খেললেও আর্জেন্টিনার স্থানীয় ক্লাবগুলো তার এই শারীরিক অসুস্থতার কারণে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল।
পরবর্তীতে স্পেনের বার্সেলোনা ক্লাব সেই শিশুটিকে একটি সুযোগ দেয় এবং একটি সাধারণ ন্যাপকিন পেপারে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর পরের ঘটনা সবারই জানা। যে শিশুর শরীর বাড়ছিল না, অর্থের অভাবে যার চিকিৎসা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, সেই পরবর্তীতে হয়ে উঠলেন পৃথিবীর সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবল তারকা। তিনি আর কেউ নন, লিওনেল আন্দ্রেস মেসি।
আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরের এক সাধারণ দরিদ্র পাড়া থেকে কাতারের বিশ্বকাপ জয়ী এই তারকা ৩৯ বছর বয়সেও ফুটবল মাঠে নিজের সেরা মান ধরে রেখেছেন। ফুটবলের ইতিহাসে এত দীর্ঘ সময় ধরে এমন ধারাবাহিকতা ও উচ্চ মান বজায় রেখে খেলার নজির মেলা ভার। বিজ্ঞান ও বিভিন্ন গবেষণা বলছে, মেসির এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে পদার্থবিদ্যা, শরীরবিজ্ঞান এবং মনোবিজ্ঞানের এক অবিশ্বাস্য রসায়ন।
১৯৮৭ সালের ২৪শে জুন আর্জেন্টিনার সান্তাফে প্রদেশের রোজারিও শহরে মেসির জন্ম। তাঁর বাবা হোর্হে মেসি ছিলেন একটি ইস্পাত কারখানার কর্মী এবং মা সেলিয়া কুচ্চি ছিলেন একজন গৃহিণী। চার ভাইবোনের মধ্যে মেসি ছিলেন তৃতীয়। তবে মেসির শারীরিক গঠন নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে একটি ভুল ধারণা রয়েছে। ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি উচ্চতা এবং ৭২ কেজি ওজনের এই ফুটবলারকে মাঠে খুব বেশি পেশীবহুল বা উদ্ধত মনে হয় না। প্রখ্যাত স্পোর্টস সায়েন্টিস্ট গিলেম বালাগুয়ে তাঁর রচিত বইতে উল্লেখ করেছেন যে, মেসির এই সাধারণ শারীরিক গঠনই আসলে তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি।
পদার্থবিদ্যার নিয়ম অনুযায়ী, মেসির শরীরের মাধ্যাকর্ষণ কেন্দ্র মাটির খুব কাছাকাছি থাকায় তিনি অত্যন্ত দ্রুত গতিতে দিক পরিবর্তন করতে পারেন, যা লম্বা ফুটবলারদের পক্ষে শারীরিকভাবে অসম্ভব। ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির স্পোর্টস বায়োমেকানিক্স বিভাগের এক গবেষণায় দেখা গেছে, মেসির দিক পরিবর্তনের গড় সময় মাত্র ০.৩ সেকেন্ড, যেখানে একজন সাধারণ পেশাদার ফুটবলারের সময় লাগে ০.৫ থেকে ০.৬ সেকেন্ড। এই মাত্র ০.২ সেকেন্ডের ব্যবধানই তাঁকে প্রতিপক্ষের ট্যাকেল এড়িয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অনন্য করে তোলে।
মেসির বা পায়ের জাদু এবং বল নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা নিয়ে ফুটবল বিশ্বে অনেক আলোচনা রয়েছে। ফুটবল বিশ্লেষক জনাথন উইলসন তাঁর বিখ্যাত বইতে লিখেছেন, মেসির বা পায়ের সাথে বলের যোগাযোগ এতটাই সূক্ষ্ম যে মনে হয় বলটি তাঁর পায়ের সাথে আঠা দিয়ে লাগানো রয়েছে। স্নায়ুবিজ্ঞানের ভাষায় একে প্রোপিওসেপশন বা শরীরের নিজের অবস্থান সম্পর্কে সচেতনতা বলা হয়। মেসি বল স্পর্শ করার আগেই নিজের মস্তিষ্কে বলের গতি ও পরবর্তী অবস্থান নিখুঁতভাবে অনুমান করতে পারেন। এর পাশাপাশি তাঁর দ্রুত স্ক্যানিং করার ক্ষমতাও অনন্য।
খেলা চলাকালীন মেসি বল পাওয়ার আগেই প্রতি তিন-চার সেকেন্ডে গড়ে দুই-তিনবার মাথা ঘুরিয়ে পুরো মাঠের একটি মানসিক মানচিত্র তৈরি করে নেন। এর ফলে বল পায়ে আসার সাথে সাথেই তিনি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।মেসির ড্রিবলিং কৌশলের মধ্যেও রয়েছে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। তিনি ড্রিবল করার সময় ছোট ছোট পদক্ষেপ নেন, যার ফলে তাঁর পা মাটির সংস্পর্শে বেশি সময় থাকে এবং যেকোনো মুহূর্তে গতি পরিবর্তন করা সহজ হয়।
এছাড়া গতি হুট করে বাড়িয়ে বা কমিয়ে তিনি প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের মস্তিষ্ককে সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত করে দেন। আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ী তারকা হোর্হে ভালদানো মেসির গোল করার নিখুঁত দক্ষতা সম্পর্কে বলেছেন, গোল করার চূড়ান্ত মুহূর্তে মেসি অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথার একজন সার্জনের মতো আচরণ করেন, যা অত্যন্ত বিরল। বার্সেলোনার সাবেক কিংবদন্তি কোচ পেপ গার্দিওলা এবং জাভি হার্নান্দেজও মেসির এই অনন্য ফুটবল বুদ্ধির প্রশংসা করেছেন। বয়স বাড়ার সাথে সাথে নিজের খেলার ধরন পরিবর্তন করে গতি কমলেও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে মাঠ শাসন করার এক নতুন সংজ্ঞা তৈরি করেছেন এই ফুটবল জাদুকর।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন