বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

কেন বাংলাদেশিরা শুধু ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা ফুটবল দলকে সমর্থন করে

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

জুলাই ৫, ২০২৬, ০৮:৫৪ পিএম

কেন বাংলাদেশিরা শুধু ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা ফুটবল দলকে সমর্থন করে

বাংলাদেশে ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার পক্ষে যে বিপুল উন্মাদনা দেখা যায়, তার পেছনে গভীর মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে। প্রায় ১৬ হাজার কিলোমিটার দূরের ব্রাজিলের পাঁচ তারকা সম্বলিত জার্সি কিংবা ১৭ হাজার কিলোমিটার দূরের আর্জেন্টিনার আকাশী-সাদা পতাকাকে কেন্দ্র করে এদেশের সমর্থকদের পাগলামি সামাজিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। দূর অতীতের আন্তর্জাতিক আসরগুলোতে রেফারিদের বিতর্কিত সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এদেশের রাজপথে আন্দোলন থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদে নিন্দা প্রস্তাব পর্যন্ত উত্থাপিত হওয়ার নজির আছে। 

১৯৮৬ সালের আসরে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ের পর ১৯৯০ সালের ফাইনালে রেফারির পক্ষপাতিত্বের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে জাতীয় সংসদে আলোচনা হয়েছিল। ১৯৯৪ সালে এক কিংবদন্তি তারকাকে নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদে ফিফা সভাপতির কুশপুত্তলিকা দাহ করার মতো ঘটনাও ঘটেছে এদেশের মাটিতে।নিজস্ব দেশের ফুটবল দল বিশ্বমঞ্চে না থাকার শূন্যতাই এদেশের মানুষকে ল্যাটিন আমেরিকান ফুটবলের দিকে ধাবিত করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আশির দশক থেকে এদেশের ঘরে ঘরে রঙিন টেলিভিশন পৌঁছাতে শুরু করে। বিশেষ করে ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপটি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ সম্প্রচার করায় সাধারণ মানুষের সাথে পরিচয় ঘটে জাদুকরী ফুটবল শৈলীর। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই আসরে বিতর্কিত হাত দিয়ে করা গোল ও পরবর্তী সময়ে মাঝমাঠ থেকে একাই পাঁচজন ফুটবলারকে কাটিয়ে করা শতাব্দীর সেরা গোলটি বাংলাদেশিদের মনে স্থায়ী আসন করে নেয়। অন্যদিকে টেলিভিশনের যুগেরও আগে থেকে রেডিওর মাধ্যমে ফুটবল জাদুর কথা ছড়িয়ে পড়ায় ব্রাজিলের সমর্থক গোষ্ঠী গড়ে ওঠে। 

১৯৫৮, ১৯৬২ এবং ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপে অনন্য পারফরম্যান্সের ওপর ভর করে এদেশের মানুষের মনে হলুদ জার্সির প্রতি গভীর ভালোবাসা তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীতে জিকো, সক্রেটিস, রোমারিও, রোনালদো, রোনালদিনহো হয়ে নেইমার পর্যন্ত এই জনপ্রিয়তার ধারা বজায় থাকে।দারিদ্র্য ও কঠিন পরিস্থিতি থেকে উঠে আসা তারকাদের জীবনসংগ্রামকে সাধারণ বাংলাদেশিরা খুব সহজে নিজেদের জীবনের সাথে মেলাতে পেরেছেন। ল্যাটিন আমেরিকার এই ফুটবলারদের ছেলেবেলায় ফুটবল কেনার সামর্থ্য না থাকায় মোজার ভেতর কাগজ ঢুকিয়ে খেলার কিংবা অভাবের সংসারে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটার গল্প এদেশের মানুষের আবেগকে স্পর্শ করে।

কৃষ্ণাঙ্গ ফুটবলারদের বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে বিশ্বমঞ্চে রাজত্ব করার বিষয়টিও এখানে সমানভাবে সমাদৃত। তেমনিভাবে ফুটবল মাঠে শক্তিশালী সাম্রাজ্যবাদী প্রতিপক্ষকে হারিয়ে অবদমিত সাধারণ মানুষের জয় ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাগুলো মনস্তাত্ত্বিকভাবে এদেশের দর্শকদের গভীরভাবে নাড়া দেয়। ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধে ইংল্যান্ডের কাছে পরাজয়ের পর ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ফুটবল মাঠের প্রতিশোধ এদেশের শোষিত মানুষের মনে এক ধরনের মানসিক তৃপ্তি দিয়েছিল।

পরবর্তী প্রজন্মে এই উন্মাদনা ধরে রাখতে বড় ভূমিকা পালন করেছে ল্যাটিন পরাশক্তিদের ধারাবাহিক তারকা উৎপাদন ও মনস্তাত্ত্বিক কিছু সামাজিক প্রভাব। সমাজে একটি বড় অংশ যখন কোনো একটি নির্দিষ্ট দল বা মতকে অনুসরণ করে, তখন অন্যরাও কোনো গভীর কারণ ছাড়াই সেই স্রোতে গা ভাসিয়ে দেয়। মনস্তত্ত্বে একে ব্যান্ডওয়াগন প্রভাব বলা হয়ে থাকে। আশেপাশের সবাইকে নির্দিষ্ট কোনো দলের জার্সি পরতে বা পতাকা ওড়াতে দেখে নতুন প্রজন্মও নিজ থেকেই সেই সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে। এর ফলে এদেশের ফুটবল সমর্থন মূলত একটি দ্বিমুখী ধারায় রূপ নিয়েছে যেখানে অধিকাংশ মানুষ হয় আর্জেন্টিনার সমর্থক নতুবা ব্রাজিলের অনুসারী।

নিজেদের ফুটবল দল যখন বৈশ্বিক তালিকায় পেছনের সারিতে থাকে, তখন মানুষ অন্য কোনো সফল দলের জয়ের সাথে নিজের আত্মপরিচয়কে যুক্ত করে এক ধরনের পরোক্ষ গৌরব খোঁজে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ফুটবল নিয়ে যে তীব্র আবেগ দেখা যায়, তা মূলত বিনোদনের সীমিত সুযোগ এবং ফুটবল সংস্কৃতির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের এক অনন্য সামাজিক বহিঃপ্রকাশ। ১৭ হাজার মানুষের অংশগ্রহণে করা সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, এদেশের ৭৩ শতাংশ মানুষ মনে করেন তারা নিজেদের জীবনে বাংলাদেশকে বিশ্বকাপে খেলতে দেখে যেতে পারবেন না।