সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,
মসলা জাতীয় ফসল

যশোরে সবুজ এলাচ চাষে আশার আলো দেখছেন চাষি

কৃষি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬, ১২:০৬ পিএম

যশোরে সবুজ এলাচ চাষে আশার আলো দেখছেন চাষি

দেশে উচ্চমূল্যের মসলাজাতীয় ফসল হিসেবে এলাচের চাহিদা প্রায় পুরোটাই আমদানির মাধ্যমে মেটানো হয়। বাজারে প্রতি কেজি ভালো মানের এলাচ চার থেকে ছয় হাজার টাকায় বিক্রি হয়ে থাকে। অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ও লাভজনক হওয়া সত্ত্বেও দেশের মাটিতে মসলা এলাচের বাণিজ্যিক বাগান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অতীতে বড় ধরনের কোনো সাফল্য দেখা যায়নি। তবে দীর্ঘদিনের শ্রম ও ধৈর্যকে পুঁজি করে যশোরের শার্শা উপজেলার বেনাপোল গ্রামের কৃষক শাহজাহান আলী সবুজ এলাচ চাষে আশার আলো দেখতে শুরু করেছেন।

২০১২ সালে ঢাকার চকবাজারে এলাচের আকাশছোঁয়া বাজারদর দেখে দেশে এই মসলা চাষের উপায় খুঁজতে শুরু করেন তিনি। সে সময় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বুনো জাতের চারা সংগ্রহ করলেও সেগুলোতে কাঙ্ক্ষিত কোনো মসলা পাওয়া যায়নি। পাহাড়ের ঢালে হওয়া ওই জাতের এলাচ গাছের আগায় বা গোড়ায় আনারসের মতো কিংবা হলুদের ফুলের থোকার মতো দেখতে হলেও তা ছিল সুগন্ধহীন।

পরবর্তীতে আফ্রিকা অঞ্চলের তানজানিয়া বা মরিচানিয়া থেকে সংগৃহীত বিশেষ রেনু মাধ্যমে আনা ছোট সবুজ জাতের এলাচের চারা রোপণ করে ২০১৬ সাল থেকে মূল প্রকল্প গড়ে তোলেন তিনি। তবে পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় আমপানের প্রলয়ে তার পুরো এলাচ বাগান পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়। এতে তার ফলন ও অগ্রগতি কয়েক বছর পিছিয়ে যায়।

ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষত কাটিয়ে ২০২০ সালের শেষভাগে নতুন করে মেহগনি গাছের ছায়াযুক্ত বাগানে এলাচ রোপণ শুরু করেন শাহজাহান আলী। বর্তমানে তার বাগানের গাছগুলোর বয়স সাড়ে তিন বছর পেরিয়েছে। গাছের গোড়া থেকে কচুর লতির মতো লম্বা থোকা বের হয়ে ফুল ফোটা শুরু করেছে এবং তাতে ছোট ছোট ফলের গুটিও বাঁধতে শুরু করেছে। এই গুটি বড় হয়ে পরিপক্ব হতে সময় নেয় প্রায় ১২০ দিন।

তিনি জানান, রোপণের দুই থেকে আড়াই বছর পর এলাচ গাছে ফুল আসার প্রাথমিক শক্তি তৈরি হয়। তৃতীয় বছরে সামান্য ফলন আসে এবং এরপর থেকে ফলন পর্যায়ক্রমে বাড়তে থাকে। একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ থেকে শুকনা অবস্থায় বছরে দুইশত গ্রাম থেকে এক কেজি পর্যন্ত ফলন পাওয়া সম্ভব। গাছটি সর্বোচ্চ ২০ বছর পর্যন্ত ফলন দেওয়ার সক্ষমতা রাখে এবং বয়স বাড়ার সাথে সাথে উৎপাদন কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়।

এলাচ চাষের জন্য দোআঁশ মাটি সবচেয়ে উপযোগী, বেলে মাটিতে এই গাছ একেবারেই টেকে না। রোপণের সময় মাটিতে কোনো ধরনের রাসায়নিক বা তীব্র জৈব সার দেওয়া নিষিদ্ধ, কারণ নতুন চারার শিকড় অতি সংবেদনশীল হওয়ায় সারের প্রভাবে পচে মারা যেতে পারে। শিকড় স্বাভাবিকভাবে মাটির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার পরই কেবল সার প্রয়োগ করা নিরাপদ।

গাছের বৃদ্ধির জন্য রোদ নয়, বরং শীতল ছায়াযুক্ত পরিবেশ প্রয়োজন। কাঠজাতীয় বড় গাছের বাগানের নিচে পর্যাপ্ত বাতাস ও আলো প্রবেশের ফাঁকা জায়গা থাকলে এলাচ সবচেয়ে ভালো বাড়ে। কোনো কারণে প্রখর রোদ বা অতিরিক্ত গরম থাকলে ফুল ও লতি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

বাগান ব্যবস্থাপনায় প্রতি একর জমিতে বছরে দুই দফায় সার প্রয়োগ করতে হয়। জুন-জুলাই এবং নভেম্বর-ডিসেম্বরে প্রতি একরে পঞ্চাশ কেজি করে ইউরিয়া, টিএসপি ও পটাশ সার ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। এর বাইরে গাছের গোড়ায় নিয়মিত জৈব সার ব্যবহার করা যায়। এছাড়া গরমে পাতায় কোনো ধরনের রোগের আক্রমণ দেখা দিলে নাটিভো বা ব্যারিড জাতীয় অনুমোদিত ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে হয়।

ফলনের পাশাপাশি চারার চাহিদাও তৈরি হয়েছে। আফ্রিকান রেনু থেকে চার মাস বয়সী চারা তৈরি করে পলি ব্যাগে প্রস্তুত করা হচ্ছে। প্রতিটি চারা তিনি ৩৫০ টাকা দরে কৃষকদের সরবরাহ করছেন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান ও রাঙামাটিসহ দেশের উত্তরাঞ্চলের বেশ কিছু চাষি তার কাছ থেকে চারা নিয়ে রোপণ করে ইতিবাচক ফল পেতে শুরু করেছেন।

অব্যবহৃত ও ছায়াযুক্ত পতিত জমিকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় এনে পরিকল্পিতভাবে সবুজ এলাচ চাষ করা গেলে মসলাটির আমদানিনির্ভরতা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।