সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি কারও বিরোধী নয় বলে মত এরদোয়ানের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬, ১২:১৪ পিএম

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি কারও বিরোধী নয় বলে মত এরদোয়ানের

ছবি: সংগৃহীত

তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ত্রিপক্ষীয় মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি ইরান, ইসরাইল কিংবা অন্য কোনো সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লক্ষ্য করে গঠিত কোনো সামরিক জোট নয় বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোয়ান। সম্প্রতি গণমাধ্যমে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি উল্লেখ করেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা সুসংহত করা, সম্মিলিত সামরিক প্রতিরোধ সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই এই ঐতিহাসিক চুক্তির মূল লক্ষ্য।

এরদোয়ান জানান, জাতিসংঘ সনদের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদে স্বীকৃত যেকোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের আত্মরক্ষার অধিকারের আইনি ভিত্তির ওপর এই চুক্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। চুক্তির মূল ধারা অনুসারে, স্বাক্ষরকারী তিন দেশের যেকোনো একটি রাষ্ট্রের ওপর সশস্ত্র সামরিক আগ্রাসন ঘটলে তা বাকি দুই দেশের ওপরও যৌথ আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে। তবে কোনো দেশ আক্রান্ত হলে প্রতিক্রিয়ার সুনির্দিষ্ট ধরন আক্রমণ কবলিত রাষ্ট্রের বাস্তব প্রয়োজন ও আনুষ্ঠানিক অনুরোধের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে।

সহায়তার সম্ভাব্য রূপরেখা তুলে ধরে এরদোয়ান বলেন, এর মধ্যে কৌশলগত গোয়েন্দা তথ্যের আদান-প্রদান, সামরিক রসদ সহায়তা কিংবা প্রয়োজনীয় গোলাবারুদ সরবরাহ অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। হুমকির তীব্রতা ও মাত্রার ওপর নির্ভর করে পরবর্তীতে আরও ব্যাপক পরিসরে সরাসরি সামরিক সহায়তার প্রশ্নও আলোচনায় আসতে পারে। তবে চুক্তির কারণে যেকোনো হামলা দেখা দিলেই তুরস্ক তাৎক্ষণিকভাবে অন্ধভাবে বা স্বয়ংক্রিয় উপায়ে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপে লিপ্ত হবে, এমন কোনো পূর্বশর্ত এই প্রতিরক্ষা রূপরেখায় নেই।

তিনি আরও বলেন, ইরাক, ইয়েমেন কিংবা গোটা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অঞ্চলে যেকোনো সম্ভাব্য সংকটের জন্য আগে থেকেই কোনো পূর্বনির্ধারিত সামরিক হামলার ছক এঁকে রাখা কৌশলগতভাবে সমীচীন হবে না। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক পরামর্শ ও সম্মিলিত সামরিক মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই পরবর্তী কার্যকর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হবে। ইসরাইলের সঙ্গে আঙ্কারার সম্পর্ক প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তুর্কি প্রেসিডেন্ট অভিযোগ করেন, সম্প্রতি ইসরাইলে তুরস্ককে একটি সম্ভাব্য আঞ্চলিক হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করার সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এর পেছনে দেশটির চলমান নির্বাচনী পরিস্থিতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণ সরাসরি কাজ করছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। 

একই সাথে তিনি মনে করিয়ে দেন, তুরস্ক বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রায় প্রতিটি সংকটে সংশ্লিষ্ট সব যুযুধান পক্ষের সাথে কার্যকর যোগাযোগ চ্যানেল টিকিয়ে রাখার অনন্য কূটনৈতিক সক্ষমতা বজায় রেখেছে। রাশিয়া ও ইউক্রেন সংঘাত থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান নানা জটিলতায় আঙ্কারা সবসময় কার্যকর শান্তির মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেছে। সিরিয়া পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করে এরদোয়ান বলেন, সিরিয়ার স্থায়ী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান শর্ত।

দেশটির সকল স্বতন্ত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীকে একটি সমন্বিত কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অধীনে নিয়ে আসাই সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সামাজিক সংহতি রক্ষার একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ। কুর্দি জনগোষ্ঠীর নাগরিকরাও যেন বৈষম্যহীন সমান অধিকারের ভিত্তিতে নিরাপদ ও স্বাধীনভাবে নিজেদের ভূমিতে বসবাস করতে পারেন, তুরস্ক এমন একটি গঠনমূলক রাষ্ট্রীয় রূপান্তরকে সমর্থন জানায়।

একই সাথে ইরানের বর্তমান পরিস্থিতির ওপর আঙ্কারা গভীর ও সতর্ক দৃষ্টি রাখছে বলে জানান এরদোয়ান। তার স্পষ্ট মূল্যায়ন, ইরানের যেকোনো অভ্যন্তরীণ সংকট বা সমস্যার সমাধান কেবল দেশটির আপামর জনগণের নিজস্ব প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই সম্পন্ন হওয়া বাঞ্ছনীয় এবং সেখানে বাইরের কোনো শক্তির অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ থাকা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি আরও অভিযোগ করেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির অপব্যবহার করে নিষিদ্ধ ঘোষিত কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি ও তাদের সহযোগী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ইরানে ফায়দা লোটার অপতৎপরতা চালাচ্ছে।

সব মিলিয়ে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিকে নতুন কোনো ইরান কিংবা ইসরাইলবিরোধী আগ্রাসী সামরিক চক্র হিসেবে না দেখে বরং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর আঞ্চলিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার আনুষ্ঠানিক স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। সেই সাথে আঞ্চলিক বহুমুখী সংঘাতের মধ্যেও সব পক্ষের সাথে খোলামেলা আলোচনার পথ খোলা রাখার পররাষ্ট্রনীতি অব্যাহত রাখার সুস্পষ্ট বার্তা তুলে ধরেছেন তুরস্কের সরকারপ্রধান।