সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬, ১২:২৫ পিএম
রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর লক্ষ্যে মিয়ানমারের সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ জোরদারের একটি নতুন কূটনৈতিক কৌশল নিয়েছে মালয়েশিয়া। এই কৌশলের অংশ হিসেবে মিয়ানমারের জেনারেল মিন অং হ্লাইংকে কুয়ালালামপুর সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানিয়েছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। আনোয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন যে নেপিদো যদি নিজ দেশের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়, তবে মালয়েশিয়া তাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বন্ধুত্ব ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ সম্প্রসারণ করতে প্রস্তুত। সম্প্রতি একটি দীর্ঘ পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে আনোয়ার ইব্রাহিম এই নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগের কথা প্রকাশ করেন।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে মিয়ানমারের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া সম্ভব, তবে শর্ত হলো দেশটিতে আশ্রিত তাদের নাগরিকদের নিজ ভূখণ্ডে ফিরিয়ে নিতে হবে। একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষকে পাঠানো বাস্তবসম্মত না হলে ধাপে ধাপে এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার বিকল্প পথও তুলে ধরেন তিনি। এর আগে জুলাইয়ে আনোয়ার জানিয়েছিলেন যে মালয়েশিয়া থেকে প্রাথমিকভাবে পাঁচ হাজার রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে আনুষ্ঠানিক সম্মতি জানিয়েছে মিয়ানমার। সেই ধারাবাহিকতায় চলতি সেপ্টেম্বরের শেষভাগে প্রায় দেড় হাজার মানুষকে স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর একটি প্রাথমিক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। তবে প্রথম দফায় সুনির্দিষ্টভাবে কতজন ফেরত যাবেন, সে বিষয়ে পুরোপুরি নিশ্চয়তা মেলেনি।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়ায় বর্তমানে নিবন্ধিত দুই লাখেরও বেশি শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থী বসবাস করছেন। এর মধ্যে শুধু রোহিঙ্গার সংখ্যাই এক লাখ ২৬ হাজারের বেশি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে এই বৃহৎ জনগোষ্ঠী দেশটির জন্য একটি জটিল মানবিক ও প্রশাসনিক চাপ তৈরি করে রেখেছে। ২০২১ সালে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ানের সদস্য হিসেবে কুয়ালালামপুর জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে তুলনামূলক কঠোর অবস্থান নিয়েছিল। তবে আনোয়ারের সাম্প্রতিক বক্তব্যে সেই নীতিতে একটি দৃশ্যমান বাস্তববাদী পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে।
মালয়েশিয়া এখন মিয়ানমারকে সম্পূর্ণ কূটনৈতিক স্বীকৃতি না দিয়েও সুনির্দিষ্ট বিষয়ে আলোচনার পথ পরীক্ষা করছে। অর্থাৎ জান্তাকে পূর্ণাঙ্গ সম্পর্কের মর্যাদা না দিয়ে পারস্পরিক সহযোগিতার শর্তে যোগাযোগ রক্ষা করাই তাদের লক্ষ্য। আনোয়ার যুক্তি দেন, নেপিদোর সঙ্গে সরাসরি কোনো যোগাযোগ না রাখলে শরণার্থীদের ফেরানোর জটিল বিষয়ে আলোচনা করা প্রায় অসম্ভব। তিনি প্রশ্ন তোলেন, মিয়ানমারের ক্ষমতাসীনদের বাদ দিয়ে আসলে কার সঙ্গে এই বাস্তব সংকট নিয়ে সমঝোতা করা যাবে। বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে এই পদক্ষেপ মূলত একটি শর্তসাপেক্ষ কূটনৈতিক যোগাযোগ। তবে এই প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা নিয়ে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
গত ২৩ সেপ্টেম্বর ১৬০টির বেশি নাগরিক ও মানবাধিকার সংগঠন এই উদ্যোগ অবিলম্বে স্থগিত রাখার আহ্বান জানায়। তাদের বক্তব্য, রাখাইনসহ মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি অত্যন্ত ভঙ্গুর ও সংঘাতপূর্ণ হওয়ায় এই মুহূর্তে শরণার্থীদের ফেরত পাঠানো হলে তারা মারাত্মক ঝুঁকির মুখোমুখি হবেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ গত আগস্টে সতর্ক করে জানিয়েছে, রাখাইনে ফেরত পাঠানো হলে রোহিঙ্গারা পুনরায় দমনপীড়ন ও পদ্ধতিগত নিপীড়নের শিকার হতে পারেন। সংস্থাটি জোরপূর্বক ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ বন্ধ রাখার দাবি জানিয়েছে। জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থাও পুনর্ব্যক্ত করেছে যে যেকোনো প্রত্যাবাসন অবশ্যই সম্পূর্ণ স্বেচ্ছামূলক, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ হতে হবে।
বিশেষ করে রাখাইনে সামরিক জান্তার একক নিয়ন্ত্রণ নেই এবং সেখানে আরাকান আর্মিসহ একাধিক বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সক্রিয় উপস্থিতির কারণে সরকারি চুক্তিতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। মালয়েশিয়ার এই নতুন উদ্যোগ বাংলাদেশের জন্যও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশে দশ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা দীর্ঘদিন ধরে আশ্রিত রয়েছেন এবং তাদের টেকসই প্রত্যাবাসনই ঢাকার মূল আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকার।
গত ২২ জুন বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর আনোয়ার ইব্রাহিম ঘোষণা করেছিলেন যে আসিয়ান কাঠামোর ভেতর থেকেই রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের উপায় খোঁজা হবে। সেখানে মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষকে আলোচনার টেবিলে আনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। ফলে কুয়ালালামপুরের এই পদক্ষেপ সফল হলে তা বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ভবিষ্যৎ প্রত্যাবাসনের একটি কার্যকর কূটনৈতিক রূপরেখা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
আসিয়ানের নিষ্ক্রিয় নীতিতেও পরিবর্তনের তাগিদ দিচ্ছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী। পাঁচ দফা ঐকমত্য সত্ত্বেও মিয়ানমারের পরিস্থিতির কোনো দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি। গত মে মাসে আনোয়ার জোটের অন্যান্য দেশকে মিয়ানমারের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে সব পক্ষের সঙ্গে ফলপ্রসূ যোগাযোগ বাড়ানোর আহ্বান জানান। সম্পূর্ণ কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার বদলে নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক এই শর্তসাপেক্ষ আলোচনার সাফল্য নির্ভর করছে মিয়ানমার বাস্তবে কতটা কার্যকর পদক্ষেপ ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেয় তার ওপর।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন