সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,
কৃষি সম্প্রসারণ সংকট

ভিয়েতনামী নারকেল চাষে সফলতার নেপথ্যে পরিচর্যা

কৃষি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬, ১১:৫৭ এএম

ভিয়েতনামী নারকেল চাষে সফলতার নেপথ্যে পরিচর্যা

দেশে উচ্চফলনশীল ও খাটো জাতের ভিয়েতনামী নারকেল চাষ সম্প্রসারণে সরকারি উদ্যোগের কয়েক বছর পর মাঠপর্যায়ে মিশ্র বাস্তবতা দৃশ্যমান হয়েছে। সঠিক বৈজ্ঞানিক পরিচর্যা এবং পর্যাপ্ত পানি নিশ্চিত করা জমিতে ব্যাপক ফলন মিললেও, গতানুগতিক পদ্ধতিতে চারা রোপণ করে ফেলে রাখা কৃষকেরা আশানুরূপ ফল না পেয়ে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন বছরব্যাপী ফল উৎপাদন প্রকল্পের মাধ্যমে কয়েক বছর আগে ভিয়েতনাম থেকে সিয়াম গ্রিন ও সিয়াম ব্লু নামের দুটি খাটো জাতের নারকেল চারা আমদানি করে দেশের বিভিন্ন জেলায় হর্টিকালচার সেন্টারের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়। স্বল্প সময়ে অর্থাৎ তিন থেকে সাড়ে তিন বছরের মধ্যে ফলন আসা, মাটির কাছাকাছি উচ্চতায় থাকায় সহজে ফল সংগ্রহ এবং ডাবে মিষ্টতাসহ অধিক পানির নিশ্চয়তার কারণে কৃষকদের মধ্যে এই জাত ঘিরে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছিল।

ঢাকার জাতীয় সংসদ ভবন সংলগ্ন চন্দ্রিমা উদ্যান এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে রোপণ করা সিয়াম গ্রিন, সিয়াম ব্লু এবং ভারত থেকে আনা ডিজি হাইব্রিড জাতের নারকেল গাছে আশাব্যঞ্জক ফলন দেখা গেছে। সাড়ে তিন বছর আগে লাগানো এসব গাছের প্রতিটিতে গড়ে ৫০ থেকে ৬০টি পর্যন্ত ডাব এসেছে, যার একটি গাছে সর্বোচ্চ ৫৮টি ডাব পর্যন্ত গণনা করা হয়েছে।

ল্যাবরেটরি ও মাঠপর্যায়ের যৌথ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই জাতের একেকটি ডাবের ওজন প্রায় দেড় কেজি থেকে পৌনে দুই কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। ভিয়েতনামের স্থানীয় পরিস্থিতিতে যেখানে একটি ডাবে আড়াইশত থেকে সাড়ে তিনশত মিলিলিটার পানি পাওয়া যায়, সেখানে বাংলাদেশের উর্বর মাটিতে প্রতিটি ডাব থেকে সাড়ে পাঁচশত থেকে সাড়ে ছয়শত মিলিলিটার পর্যন্ত পুষ্টিকর পানি পাওয়া যাচ্ছে। একই সাথে ডাবের পানির মিষ্টতার মাত্রা বা ব্রিক্স মান স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে।

তবে মাঠের বাস্তবতায় দেশের অনেক জেলায় কৃষকদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। মেহেরপুরের সুবিদপুর গ্রামের চাষি জাহিদ হাসান হর্টিকালচার সেন্টার থেকে একশতটি ভিয়েতনামী চারা এনে দুই একর জমিতে বাগান করেছিলেন। মাসে একবার সার ও কীটনাশক ব্যবহারের পরও সাড়ে তিন বছরে মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশ গাছে ফলন এসেছে এবং বাকি ৮০ শতাংশ গাছে কোনো ফলন আসেনি। একই ধরনের ক্ষতির কথা জানিয়েছেন মেহেরপুরের আরেক চাষি এজাজ আহমেদ এবং বরিশালের বাবুগঞ্জের শহিদ হাওলাদার। তাদের অভিযোগ, আড়াই থেকে তিন বছরে প্রচুর ফলনের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে আশানুরূপ ফল না পেয়ে তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মতে, সনাতন দেশি নারকেল গাছ কোনো পরিচর্যা ছাড়াই টিকে থাকতে পারলেও ভিয়েতনামী জাতের জন্য চারটি উপাদান নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। এই চারটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান হলো পর্যাপ্ত পানি, পটাশিয়াম, ক্লোরিন এবং সালফার। নিয়মিত সেচের অভাবে গাছের ফুল ও কচি ডাব ঝরে পড়ে এবং ফলন শূন্যে নেমে আসে। প্রতি তিন মাস পরপর সুষম সার ও বোরন প্রয়োগ না করলে ডাব ফেটে যাওয়ার সমস্যা দেখা দেয়।

উপকূলীয় অঞ্চলে অবশ্য ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। নোয়াখালীর হাতিয়ার পূর্ব গাছাখালি গ্রামের চাষি রাশেদ উদ্দিন এবং পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার মহসিন এই জাতের বাগান করে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছেন। মহসিনের একশত গাছের বাগান থেকে এক বছরেই তিন হাজারের বেশি নারকেল উৎপাদিত হয়েছে এবং তিনি নিজে এক হাজার চারা তৈরি করেছেন। হাতিয়ায় প্রতিটি গাছ থেকে বছরে দুইশত থেকে আড়াইশত নারকেল সংগ্রহ করছেন চাষিরা। মাটিতে দাঁড়িয়ে সহজে ডাব কাটা এবং পাতার রোগবালাই দমনের সুবিধা থাকায় স্থানীয় বাজারে এই ডাবের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে।

চাষিদের আরেকটি বড় উদ্বেগ ছিল নারকেলের পাতায় সাদা মাছির আক্রমণ। অনেকের ধারণা ছিল বিদেশ থেকে আনা চারার মাধ্যমেই এই ক্ষতিকর পোকা দেশে প্রবেশ করেছে।

বছরব্যাপী ফল উৎপাদন প্রকল্পের সাবেক পরিচালক ড. মেহেদী মাসুদ জানিয়েছেন, এই অভিযোগের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। জাহাজে করে ৪০ দিন কন্টেইনারে আসার পর প্রতিটি চালান যথাযথ উদ্ভিদ সংগনিরোধ বা ফাইটোস্যানিটারি সনদ যাচাই করে দেশে প্রবেশ করানো হয়েছে। মূলত আশির দশক থেকেই এই পোকা অঞ্চলে বিদ্যমান, যা শ্রীলঙ্কা থেকে ভারতের কেরালা ও পশ্চিমবঙ্গ হয়ে প্রাকৃতিক বাতাস ও দূরপাল্লার মাধ্যমে বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। দেশি লম্বা গাছে স্প্রে করা অত্যন্ত কঠিন হলেও খাটো জাতের গাছে সহজেই দাঁড়িয়ে স্প্রে করে সাদা মাছি দমন সম্ভব।

দেশে হঠাৎ করে নারকেল চারার তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। করোনা মহামারির সময়ে ডাবের অস্বাভাবিক চাহিদা তৈরি হওয়ায় কৃষকেরা পরিপক্ব নারকেল গাছে না রেখে কচি ডাব হিসেবে বিক্রি করে দিয়েছিলেন, যার ফলে দেশে বীজ নারকেলের সংকট তৈরি হয়। বর্তমানে কোনো প্রতিষ্ঠান বা চাষি পাঁচ লাখ চারা চাইলে তা তাৎক্ষণিকভাবে সরবরাহ করার সক্ষমতা নার্সারিগুলোর নেই।

জাতীয়ভাবে এই সংকট কাটিয়ে উঠতে এবং ফলন নিশ্চিত করতে দেশের সমগ্র অঞ্চলে ঢালাওভাবে চারা না ছড়িয়ে মূলত দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় জেলাগুলোতে ভিয়েতনামী নারকেলের একটি সমন্বিত মেগা প্রকল্প গ্রহণের সুপারিশ করছেন বিশেষজ্ঞরা। দক্ষিণবঙ্গের মাটি ও আবহাওয়া প্রাকৃতিকভাবেই নারকেল চাষের সবচেয়ে উপযোগী হওয়ায় সেখানে নিবিড় পরিচর্যার আওতায় কম গাছ লাগিয়ে পাঁচ গুণ বেশি ফলন অর্জন করা সম্ভব।