সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,
অর্থকরী উদ্যান ফসল

দিনাজপুরে সৌদি খেজুর চাষে সফল প্রবাসী জাকির হোসেন

কৃষি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬, ১২:২০ পিএম

দিনাজপুরে সৌদি খেজুর চাষে সফল প্রবাসী জাকির হোসেন

ধান ও লিচুর জন্য পরিচিত উত্তরের জেলা দিনাজপুরের মাটিতে মরুভূমির অর্থকরী ফল সৌদি খেজুরের বাণিজ্যিক চাষে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছেন এক প্রবাসী উদ্যোক্তা । পার্বতীপুর উপজেলার ফুলবাড়ী সংলগ্ন স্বজনপুকুর গ্রামে প্রায় এক একর ৫৭ শতক জমিতে এই খেজুরের বাগান গড়ে তুলেছেন কুয়েতফেরত জাকির হোসেন । মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে প্রথমে কুয়েত থেকে উন্নত জাতের বীজ এনে চারা তৈরির মাধ্যমে তিনি এই উদ্যোগ শুরু করেন । মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে তার বাগানের প্রতিটি গাছে এখন থোকায় থোকায় শোভা পাচ্ছে আজওয়া, বারহি, মেডজুল ও হেলালি জাতের পুষ্ট খেজুর ।  

 জাকির হোসেন জানান, পুরো বাগানে বর্তমানে প্রায় একশতটি খেজুর গাছ রয়েছে, যার মধ্যে পাঁচটি পুরুষ গাছ পরাগায়নের জন্য রাখা হয়েছে । এছাড়া আরও ১৯টি গাছের একটি বিশেষ প্লট রয়েছে যেখানে নিয়মিত ফলন মিলছে ।   তিনি মূলত মরুভূমির পরিবেশ অনুকরণ করতে রাবিশ বা ভিটা বালির স্তর তৈরি করে গাছ রোপণ করেছেন । দুই ফুট গভীর গর্তে শুধু বালু দিয়ে গাছ লাগানোর পর দুই মাস ধরে কোনো সার না দিয়ে গাছের শিকড়কে মাটির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে দেওয়া হয় । এরপর প্রতিটি গাছের গোড়ায় প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার কেজি ইউরিয়া, টিএসপি, পটাশ এবং হিউমিক এসিডের মিশ্রণ প্রয়োগ করা হয় ।   গাছের গোড়ার আর্দ্রতা ধরে রাখতে এবং অতিরিক্ত বৃষ্টিতে সার ধুয়ে যাওয়া ঠেকাতে শুকনো খড় দিয়ে রিং পদ্ধতিতে মালচিং করা হয় । গাছগুলোর পাতা অনেক দূর পর্যন্ত প্রসারিত হওয়ায় প্রতিটি চারা ২০ ফুট দূরত্বে রোপণ করা হয়েছে । 

  বাগানটিতে চার বছর বয়সী একটি পূর্ণাঙ্গ বারহি জাতের গাছ থেকে এবার প্রায় একশত কেজির বেশি খেজুর পাওয়া যাচ্ছে । কাঁচা অবস্থায় খাওয়ার উপযোগী এই হলুদ খেজুরের স্থানীয় বাজারমূল্য প্রতি কেজি ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা হিসেবে এক গাছ থেকেই প্রায় ৭০ হাজার টাকার ফলন এসেছে । অপর একটি আট বছর বয়সী গাছে ১২টি বড় কাঁদিতে প্রতিটিতে ১৮ থেকে ২০ কেজি করে মোট দেড়শত কেজির বেশি খেজুর ধরেছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় দেড় লাখ টাকা ।   আজওয়া জাতের গাছে নয়টি কাঁদিতে গড়ে ৭০ কেজির বেশি ফলন এসেছে । মেডজুল জাতের খেজুরের ক্ষেত্রে ফল পরিপক্ব হতে শুরু করলে মেরুন ও গাঢ় লাল বর্ণ ধারণ করে । এছাড়া হেলালি নামের আরেকটি নব্য সংগৃহীত জাতের গাছেও উন্নত মিষ্টতা ও ফলন দেখা গেছে ।   জাকির হোসেনের মতে, খেজুর চাষে দ্বিমুখী বাণিজ্যিক আয়ের সুযোগ রয়েছে । 

একটি গাছ প্রতি বছর উচ্চমূল্যের ফল দেওয়ার পাশাপাশি গোড়া থেকে একাধিক সাকার বা ডালপালা ছাড়ে, যা কেটে কলম চারা তৈরি করা যায় ।   তিনি এককালীন গ্লাস ও নার্সারি ব্যাগে তিন দফায় বাছাই করে দুই বছর বয়সী চারা প্রস্তুত করেন । এরপর জমিতে লাগানোর দুই বছরের মধ্যে অর্থাৎ মোট চার বছর বয়সে গাছগুলো ফল দেওয়া শুরু করে । গত মৌসুমে তিনি প্রায় তিন হাজার চারা বিক্রি করেছেন ।   বাগানের নিয়মিত পরিচর্যায় বছরে একবার জৈব বা গোবর সার এবং প্রতি তিন-চার মাস পরপর সামান্য রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয় । ফুল ও ফল আসার আগে ছত্রাক আক্রমণ ঠেকাতে অনুমোদিত ছত্রাকনাশক স্প্রে করে ফলগুলো চার থেকে ছয় মাস পর্যন্ত বিশেষ পলি ব্যাগে ঢেকে রাখা হয় ।   পরিপক্ব খেজুর দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণের জন্য তিনি স্থানীয় প্রক্রিয়াজাতকরণ কৌশল অনুসরণ করেন । 

সংগৃহীত ফল ফুটন্ত পানিতে কিছু সময় অর্ধ-সিদ্ধ (হাফ বয়েল) করে জীবাণুমুক্ত করার পর রোদে শুকাতে দেওয়া হয় । এর ফলে কোনো ধরনের প্রিজারভেটিভ বা রাসায়নিক ছাড়াই সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে সৌদির বাজারের মতো খেজুর তৈরি হয় এবং দীর্ঘদিন ভালো থাকে ।   

এই সাফল্য দেখতে বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষি উদ্যোক্তা ও দর্শনার্থীরা ভিড় করছেন । কৃষি সম্প্রসারণের টেকসই প্রকল্পের আওতায় শুকুরের হাটসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা তরুণদের দলও বাগানটি পরিদর্শন করেছেন ।   জাকির হোসেন বলেন, হুজুগে পড়ে রাতারাতি লাভের আশায় নামলে চলবে না, বরং সঠিক জমি নির্বাচন করে ধৈর্য ধরে সময় ও শ্রম দিলে দেশের বেকার যুবকেরা নিজেদের স্বাবলম্বী করার পাশাপাশি খেজুরের আমদানিনির্ভরতা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনতে সক্ষম হবেন ।