রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

ঝিনাইদহে অ্যাভোকাডো চাষে বিঘায় আয় ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬, ০৮:২৫ পিএম

ঝিনাইদহে অ্যাভোকাডো চাষে বিঘায় আয় ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা

ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলার কাকবাড়িয়া গ্রামে দেশের প্রথম ও সর্ববৃহৎ বাণিজ্যিক অ্যাভোকাডো বাগান গড়ে তুলে রীতিমতো তাক লাগিয়ে দিয়েছেন সফল কৃষি উদ্যোক্তা হারুনুর রশিদ মুসা। উচ্চমূল্যের ও পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ এই বিদেশি ফল চাষ করে তিনি প্রমাণ করেছেন যে সঠিক জাত ও পরিচর্যা নিশ্চিত করতে পারলে এক বিঘা জমি থেকেই অনায়াসে পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকা আয় করা সম্ভব। ২০১৬ সালে সাবেক এক কৃষি মহাপরিচালক জনাব এনামুলের গবেষণাপত্র থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি এই ব্যতিক্রমী ওষুধি ফলের আবাদ শুরু করেন, যা বর্তমানে প্রায় ১০ বিঘা জমিতে সম্প্রসারিত হয়েছে।

তাঁর এই মোট ১০ বিঘা বাগানের মধ্যে বাড়ির সাথে আড়াই বিঘা এবং অন্যত্র দেড় বিঘার পৃথক প্লটও রয়েছে। বাগানটিতে বর্তমানে ১৪ থেকে ১৫টি ভিন্ন জাতের অ্যাভোকাডো গাছ রয়েছে। উত্তর আমেরিকার মেক্সিকোতে আজ থেকে প্রায় সাত হাজার বছর আগে উৎপত্তি হওয়া এই ফলটি আফ্রিকা ও এশিয়া মহাদেশের শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া পেরিয়ে এখন বাংলাদেশের মাটিতেও সফলভাবে ফলন দিচ্ছে। মুসার বাগানের বয়স এখন ১১ বছর চলছে। গাছগুলো দেশীয় বড় আমগাছের মতোই বিশালাকার ধারণ করেছে এবং এগুলোর খুব বেশি জটিল পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না। 

প্রতিটি গাছে গড়ে প্রায় ৬০ কিলোগ্রাম পর্যন্ত ফল পাওয়া যাচ্ছে। ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার এড়াতে এবং পাখি ও পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে ফল সুরক্ষিত রাখতে তিনি ব্যাগিং পদ্ধতি এবং ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করছেন। পুষ্টিগুণের দিক থেকে বিশ্বজুড়ে অদ্বিতীয় হিসেবে পরিচিত এই ফলের স্বাদ প্রচলিত মিষ্টি ফলের সম্পূর্ণ বিপরীত। পাকার পরও এই ফলের রং সাধারণত সবুজই থেকে যায়। এর স্বাদ অনেকটা মাখন বা সেদ্ধ ডিমের কুসুমের মতো। হারুনুর রশিদ মুসা জানান, মানুষ যত খাবার খায় তার নির্যাস শরীরে ক্ষতিকর ফ্যাট বা চর্বি হিসেবে জমা হয়, আর অ্যাভোকাডোর সবচেয়ে বড় কাজ হলো মানবদেহ থেকে এই ক্ষতিকর চর্বি অপসারণ করা। এটি শরীরে স্থায়ীভাবে বাসা বেঁধে অন্যান্য রোগ প্রতিরোধে বাধা দেয় এবং শিশুদের মেধা বিকাশে দারুণ কার্যকরী ভূমিকা রাখে। ডায়াবেটিস ও কিডনি রোগীদের জন্যও এটি অত্যন্ত উপকারী।

কৃষকের মাঠ পর্যায় থেকে পাইকারি বাজারে এই ফল প্রতি কেজি ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অনলাইন মাধ্যম এবং পাইকারদের হাত ঘুরে এই ফল যখন সাধারণ ভোক্তার কাছে পৌঁছায়, তখন এর খুচরা মূল্য দাঁড়ায় এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত। অন্যদিকে বিদেশ থেকে আমদানি করা অ্যাভোকাডো বাজারে বিক্রি হয় দেড় থেকে দুই হাজার টাকা কেজি দরে। তবে এ বছর বাজারে ফলের চাহিদা কিছুটা কম থাকার কারণ হিসেবে এক শ্রেণির অসাধু চাষির অতি মুনাফার লোভকে দায়ী করেছেন এই উদ্যোক্তা। তিনি জানান, গত জুন মাসে কিছু চাষি ফল পরিপূর্ণভাবে পরিপক্ব হওয়ার আগেই তা পেড়ে বেশি দামে বাজারে বিক্রি করে দেন। অপরিপক্ব ফলগুলো ক্রেতারা বাসায় নিয়ে পাকাতে ব্যর্থ হয়ে পচে যাওয়ায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন, যার ফলে পরিপক্ব ও মানসম্মত ফলের প্রতিও এবার ক্রেতাদের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।

নতুন করে যারা অ্যাভোকাডো চাষে আগ্রহী, তাদের জন্য মুসা কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি জানান, শুধুমাত্র প্রচারণার ওপর ভিত্তি করে এবং অনভিজ্ঞদের পরামর্শে এই ফল চাষে নামলে লোকসানের প্রবল ঝুঁকি রয়েছে। বাংলাদেশে সঠিক জাতের সায়ন ও চারার তীব্র সংকট রয়েছে। অনেক নার্সারি ও চাষি শুধু চারা বিক্রির ব্যবসায় মনোযোগ দেওয়ায় ভেজাল চারার ছড়াছড়ি শুরু হয়েছে। নিচু জমিতে এই গাছ লাগালে তা নিশ্চিতভাবে মারা যাবে। 

ভেজাল জাতের মিশ্রণ রোধ করতে এবং চাষে নিজের মনোযোগ ধরে রাখতেই তিনি বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপক হারে চারা উৎপাদন থেকে বিরত রয়েছেন। উচ্চমূল্যের ফল চাষে ধারাবাহিক সফলতার স্বীকৃতিস্বরূপ হারুনুর রশিদ মুসা ২০২৩ ও ২০২৪ সালে পরপর দুবার শ্রেষ্ঠ কৃষি উদ্যোক্তা ও ফল চাষি হিসেবে জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেছেন।