সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬, ১১:২৪ এএম
দক্ষিণ-পশ্চিমের সীমান্তবর্তী জেলা চুয়াডাঙ্গার উর্বর মাটিতে এবার বিদেশি ফল আঙুর চাষে কিছু সাফল্য এলেও এর আড়ালে নতুন উদ্যোক্তাদের ঘিরে চড়া মূল্যে চারা বিক্রির ফাঁদ তৈরি হচ্ছে। জীবননগর উপজেলায় বাঁশের মাচায় থোকা থোকা ফলন দেখিয়ে এক শ্রেণির চাষি অতি মুনাফার লোভে চড়া মূল্যে চারা বিক্রি শুরু করেছেন। ফলে অতীতে চায়না কমলায় লাখ লাখ টাকার পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হওয়া কৃষকদের মতো এবারও নতুন চাষিরা সর্বস্ব হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছেন।
জীবননগর উপজেলার হাসাদহ গ্রামের আশরাফুল ইসলাম ও তরিকুল ইসলাম নামের দুই ভাই সাড়ে তিন বিঘা জমিতে পার্পেল ও বাইকুনুর জাতের ৭৫০টি চারা রোপণ করে ফলন পেয়েছেন। বাঁশের মাচায় সবুজ ও লাল রঙের আঙুর দেখে আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিনই নতুন চাষিরা তাদের বাগানে ভিড় করছেন।
তাদের বাগানে প্রায় চারশত গাছে ফলন এসেছে এবং সাড়ে তিন বিঘা বাগান করতে তাদের মোট খরচ হয়েছে প্রায় সাত লাখ টাকা। দুই ভাইয়ের প্রত্যাশা, প্রতিটি গাছ থেকে গড়ে ১৫ কেজি করে ফল পেলে মোট উৎপাদন দাঁড়াবে প্রায় ১১ হাজার ২৫০ কেজিতে। স্থানীয় পর্যায়ে পাইকারিতে প্রতি কেজি আঙুর ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকায় এবং খুচরায় ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে ফল বিক্রির চেয়েও বেশি লাভ হচ্ছে চারা বাণিজ্যে। তারা প্রতিটি চারা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি করছেন। অনেকে এক বিঘা বা দেড় বিঘা জমিতে বাগান করার জন্য সাড়ে তিনশত পর্যন্ত চারা সংগ্রহ করছেন। চুয়াডাঙ্গায় ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে ড্রাগন, মাল্টা ও পেয়ারা চাষ করা প্রবীণ কৃষক আবুল হোসেন নিজের এক বিঘা জমিতে বাইকুনুর জাতের আঙুর ফলিয়েছেন। তবে তিনি নতুন চাষিদের সতর্ক করে জানিয়েছেন, কোনো জাত নিশ্চিত না হয়ে হুজুগে নেমে পড়লে কৃষকেরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়বেন।
কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, আঙুর গাছের ডাল বা কাটিং কেটে খুব সহজেই চারা তৈরি করা যায়। এর উৎপাদন খরচ অত্যন্ত কম হওয়ায় একটি চারার সর্বোচ্চ দাম ২০ থেকে ২৫ টাকার বেশি হওয়া কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। অথচ বাজারে এটি দশ থেকে পনেরো গুণ বাড়তি দামে বিক্রি করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতি চুয়াডাঙ্গার কৃষকদের ২০১৭ ও ২০১৮ সালের চায়না কমলা বিপর্যয়ের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। সে সময় জীবননগর উপজেলার নিধিকুণ্ড গ্রামের ওমর ফারুকের বাগানে ব্যাপক কমলা ধরার পর সারা দেশ থেকে চাষিরা চড়া দামে চারা কেনেন। পরবর্তীতে অধিকাংশ গাছে কাঙ্ক্ষিত ফল আসেনি, ফলের ভেতরে রস না থাকা এবং অতিরিক্ত বিচির কারণে ফল বিক্রি না হওয়ায় ক্ষোভে বাগান কেটে ফেলেছিলেন শত শত কৃষক। গড়ে প্রতি বিঘায় তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা খুইয়ে পথে বসেছিলেন বহু উদ্যোক্তা।
একই ভুলের পুনরাবৃত্তি রোধে এখনই কৃষকদের বাণিজ্যিকভাবে বিস্তীর্ণ জমিতে আঙুর বাগান গড়ে না তোলার পরামর্শ দিচ্ছে কৃষি বিভাগ। চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক কৃষ্ণ রায় জানিয়েছেন, আঙুর চাষের বিষয়টি এখনো মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষামূলক স্তরে রয়েছে। টানা তিন থেকে চার বছর ধারাবাহিকভাবে আশানুরূপ ফলন এবং তার স্থায়িত্ব পর্যবেক্ষণ করার পরই বোঝা যাবে এটি এ দেশের আবহাওয়ায় বাণিজ্যিকভাবে টেকসই হবে কি না। তাই এখনই চড়া দামে চারা কিনে বড় বিনিয়োগ না করার আহ্বান জানান তিনি। জীবননগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলমগীর হোসেন জানান, চলতি মৌসুমে উপজেলায় প্রায় ৩০ বিঘা জমিতে আঙুরের চাষ হয়েছে। বিশেষ করে বাইকুনুর জাতের আঙুর জেলায় এবারই প্রথম আবাদ হয়েছে। এই জাতের অন্যতম সমস্যা হলো থোকার সব ফল একসাথে পরিপক্ব হয় না, যার ফলে ফসল সংগ্রহে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হয়। ফলন থেকে শুরু করে পাকা পর্যন্ত নিয়মিত পরিচর্যা ও সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকলে এতে সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ।
প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে দেশে আঙুর আমদানি করা হয়। দেশে উচ্চমূল্যের এই ফলের সফল সম্প্রসারণ বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় এবং কৃষকের সমৃদ্ধি আনতে পারে। কিন্তু মাঠ কর্মকর্তাদের হুঁশিয়ারি, বিজ্ঞানভিত্তিক চাষাবাদ ও দীর্ঘমেয়াদি ফলন নিশ্চিত না করে কেবল ফলন প্রদর্শনীর মাধ্যমে চারা বেচার অনৈতিক প্রতিযোগিতা চলতে থাকলে নতুন কৃষি উদ্যোক্তারা আরও একবার নিঃস্ব হবেন।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন