রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,
কৃষিতে বাণিজ্যিক বিপ্লব

নাগা মরিচ চাষে হাওরের চরে কৃষকদের ভাগ্যবদল

কৃষি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬, ১২:৫২ পিএম

নাগা মরিচ চাষে হাওরের চরে কৃষকদের ভাগ্যবদল

সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার নয়াবাজারসংলগ্ন নয়াপ্রান্তের নয়াগ্রাম উত্তর হাওর এলাকায় একসময় শত শত বিঘা জমি পতিত পড়ে থাকত। সেই বালুময় ও অনাবাদি চরে উচ্চমূল্যের সুগন্ধি নাগা মরিচ ও সুস্বাদু হাইব্রিড তরমুজ চাষ করে নিজেদের ভাগ্য বদলে দিয়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। এসব জমিতে উৎপাদিত বিষমুক্ত বোম্বাই বা নাগা মরিচ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে।

অনাবাদি চরে শুরু হওয়া উদ্যোগটি এখন পুরো এলাকার গ্রামীণ অর্থনীতি পাল্টে দিয়েছে। গোয়াইনঘাটের এই চরে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে নাগা মরিচ চাষ শুরু করেছিলেন কৃষক হেলাল উদ্দিন। শুরুতে মাত্র চারজন কৃষককে নিয়ে তিনি এই ঝুঁকি নেন। বালুমাটি ও ভরাট হওয়া লালচে দোআঁশ মাটিতে নাগা মরিচের বাম্পার ফলন দেখে ধীরে ধীরে অন্য কৃষকরাও এতে যুক্ত হন। বর্তমানে এই এলাকায় সত্তর থেকে আশি জন কৃষক বাণিজ্যিকভাবে নাগা মরিচ চাষ করছেন।

প্রথম দফায় মরিচ বিক্রি করেই নিজের আয়ে দুটি গাড়ি কিনেছেন বলে জানান হেলাল উদ্দিন। তিনি প্রায় দশ বিঘা জমিতে নাগা মরিচের আবাদ করেছেন। প্রতি বিঘা জমিতে চারা রোপণ, পরিচর্যা ও মাচা তৈরিসহ উৎপাদন খরচ হয় প্রায় এক থেকে দেড় লাখ টাকা। তার দশ বিঘা জমিতে মোট খরচ হয়েছে প্রায় দশ থেকে বারো লাখ টাকা। তবে এই জমি থেকেই মৌসুমে চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ লাখ টাকার মরিচ বিক্রির আশা করছেন তিনি।

ক্ষেত থেকে প্রতি সপ্তাহে নিয়মিত মরিচ তোলা হয়। স্থানীয়ভাবে কচি বা অপ্রাপ্তবয়স্ক মরিচকে বলা হয় ডিগা মরিচ। এই ডিগা মরিচ পূর্ণাঙ্গ রূপ নিলে আকারে প্রায় দ্বিগুণ হয়। কুয়াশার কারণে মরিচের গায়ে স্বাভাবিক সাদাটে ভাব আসে, যা আবহাওয়ার প্রাকৃতিক প্রভাব। রপ্তানির মান ঠিক রাখতে নিরাপদ ও বিষমুক্ত চাষাবাদে কঠোর সতর্কতা মেনে চলা হয়। গাছে অনুমোদিত বালাইনাশক ব্যবহারের চব্বিশ ঘণ্টা পর্যন্ত এর কার্যকারিতা থাকে। এরপর আরও পাঁচ থেকে দশ ঘণ্টা অতিরিক্ত সময় পার করে পুরোপুরি নিরাপদ অবস্থায় ক্ষেত থেকে মরিচ সংগ্রহ করা হয়। স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তা মো. মনজুর আলমের পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তায় কৃষকরা নিরাপদ চাষের এই নিয়মগুলো আয়ত্ত করেছেন। চরের লালচে মাটি নাগা মরিচ চাষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী হলেও শক্ত খড়ি বা এঁটেল মাটিতে ফলন কিছুটা কম হয়।

নাগা মরিচের পাশাপাশি এই চরের নয়শ থেকে প্রায় এক হাজার বিঘা জমিতে হাইব্রিড তরমুজের বিশাল সমারোহ গড়ে উঠেছে। প্রায় পঞ্চাশ থেকে ষাট জন কৃষক তরমুজ চাষে যুক্ত রয়েছেন। এখানকার বেলে-দোআঁশ মাটির বিশেষ গুণের কারণে তরমুজের ভেতরটা হয় গাঢ় রক্তলাল ও অতুলনীয় মিষ্টি। একেকটি তরমুজ আট থেকে দশ কেজি পর্যন্ত ওজন হয়ে থাকে। দূরদূরান্ত থেকে পাইকাররা এসে ক্ষেত থেকেই তরমুজ কিনে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বড় ফলের বাজারে সরবরাহ করছেন। এছাড়া চরের প্রায় এক হাজার বিঘা জমিতে বোরো ধানের আবাদও রয়েছে।

কয়েক বছর আগেও যেখানে এক চিলতে ফসল ফলত না, কৃষকদের নিরলস পরিশ্রম ও বাণিজ্যিক চিন্তায় সেই পতিত চর এখন সবুজের সমারোহে কোটি টাকার অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় রূপ নিয়েছে।