রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

হাঁস প্রজননে নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় খামারের সাফল্য

কৃষি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬, ১১:৪২ এএম

হাঁস প্রজননে নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় খামারের সাফল্য

দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে অধিক উৎপাদনশীল হাঁসের বাচ্চা ছড়িয়ে দিয়ে দারিদ্র্য বিমোচন ও গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা করতে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় হাঁস প্রজনন খামার। ১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠিত ছয় দশমিক দুই সাত একর আয়তনের এই সরকারি খামারে বর্তমানে ছয়টি ভিন্ন প্রজাতির হাঁস বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পালন ও বংশবৃদ্ধি করা হচ্ছে।

খামারের মূল লক্ষ্য হলো কৃষকদের কাছে উন্নত জাতের সুস্থ বাচ্চা পৌঁছে দেওয়া। বর্তমানে এই খামারে বেজিং বা পিকিং, জিনডিং, খাকি ক্যাম্পবেল, ইন্ডিয়ান রানার, দেশি সাদা এবং দেশি কালো—এই ছয়টি জাতের হাঁস লালন-পালন করা হচ্ছে। খামারের কর্মকর্তারা জানান, প্রান্তিক খামারিদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরকারি ভর্তুকি মূল্যে প্রতিটি বাচ্চা মাত্র বিশ টাকায় বিতরণ করা হয়। দূরদূরান্তের খামারিরা মোবাইল ব্যাংকিং ও টেলিফোনে অগ্রিম বুকিং দিয়ে এসব বাচ্চা সংগ্রহ করতে পারেন।

মাটি ও আবহাওয়ার সাথে খাপ খাইয়ে ডিম ও মাংস উভয়ের জন্য সবচেয়ে উপযোগী জাত হলো চীনা বংশোদ্ভূত বেজিং হাঁস। সঠিক পুষ্টি ও অতিরিক্ত খাবার সরবরাহ নিশ্চিত করলে তিন থেকে চার মাসেই এদের ওজন চার থেকে পাঁচ কেজিতে পৌঁছায়। বেজিং হাঁস বছরে ১৬০ থেকে ২০০টি ডিম দেয়। সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় মাস বয়সে এরা ডিম পাড়া শুরু করে এবং আঠারো মাস পর্যন্ত সর্বোচ্চ উৎপাদন বজায় থাকে। ব্রুডার ঘর থেকে বের হওয়ার পর প্রতিটি বেজিং হাঁসকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত দৈনিক ১৯০ থেকে ২০০ গ্রাম হারে মোট ১৭ থেকে ২০ কেজি দানাদার খাবার দিতে হয়।

অন্যদিকে কেবল ডিম উৎপাদনের জন্য শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে জিনডিং জাত। যেকোনো বৈরী আবহাওয়া ও খোলা জলাশয়ে সহজে মানিয়ে নেওয়া এই হাঁস মাত্র ১০০ থেকে ১২০ দিনের মধ্যে ডিম দেওয়া শুরু করে। বছরে এরা ২৫০ থেকে ২৭০টি পর্যন্ত ডিম দিতে সক্ষম। জিনডিং হাঁসের বাচ্চাকে চার থেকে সাড়ে চার মাস বয়সে ডিম পাড়ার উপযোগী করতে মোট ১৪ থেকে ১৫ কেজি খাবার লাগে। মাংসের জন্য চার মাস বয়সে বিক্রি করলে প্রতিটি হাঁসের ওজন হয় দেড় থেকে দুই কেজি।

খামারের উপ-সহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা জানান, হাঁসের খাদ্যতালিকায় ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ গম বা ভাঙা ভুট্টা থাকা আবশ্যক। সাথে চালের কুঁড়া, সয়াবিন মিল ও শুঁটকি মাছের গুঁড়া প্রোটিনের উৎস হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তবে আস্ত ধান খাওয়ানো সম্পূর্ণ অনুচিত, কারণ ধানের শক্ত তুষ গলায় আটকে হাঁস মারা যেতে পারে। খোলস গঠনের জন্য খাদ্যে প্রতি একশ কেজিতে আধা কেজি খাওয়ার লবণ এবং পর্যাপ্ত ঝিনুক চূর্ণ বা চুনাপাথর মেশাতে হয়, যা ঠোকাঠুকির রোগ প্রতিরোধ করে।

আবদ্ধ পদ্ধতিতে হাঁস পালনে স্থান ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি বড় হাঁসের জন্য ঘরে ও বাইরের উন্মুক্ত স্থানে দুই থেকে আড়াই বর্গফুট জায়গা বরাদ্দের নিয়ম। শেডে প্রতিদিন ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা আলোর ব্যবস্থা রাখতে হয়। সাঁতার কাটা ও গোসলের জন্য পাঁচ থেকে ছয় ইঞ্চি গভীরতার ঢালু ড্রেন বা জলাধারের ব্যবস্থা রাখা জরুরি, যার পানি দিনে অন্তত তিনবার পরিষ্কার পানি দিয়ে বদলাতে হয়। এছাড়া প্রজননের উর্বর ডিম পেতে প্রতি সাত থেকে আটটি মাদি হাঁসের জন্য একটি করে উপযুক্ত বয়সের নর হাঁস রাখার নির্দেশনা রয়েছে।

হ্যাচারিতে ফোটানোর জন্য ৫০ থেকে ৬০ গ্রাম ওজনের মসৃণ খোসার ডিম বাছাই করা হয়। দুটি ডিমের মধ্যে মৃদু ঠোকা দিয়ে শব্দের মাধ্যমে সূক্ষ্ম ফাটল পরীক্ষা করে কেবল শতভাগ ত্রুটিমুক্ত ডিম ফুটানোর জন্য নেওয়া হয়।

পোলট্রি ডেভেলপমেন্ট কর্মকর্তা জানান, হাঁস পালনে সবচেয়ে সংবেদনশীল সময় হলো জীবনের প্রথম ত্রিশ দিন। ব্রুডার ঘরে প্রথম সপ্তাহে প্রতি বাচ্চার জন্য দৈনিক ১৫ গ্রাম খাবার বরাদ্দ থাকে, যা প্রতি সপ্তাহে ১০ গ্রাম করে বাড়ানো হয়। শীতকালে এই ঘরের তাপমাত্রা ৪০ থেকে ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং গ্রীষ্মে ৩৭ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস রাখা প্রয়োজন। মেঝেতে ধানের তুষ, কাঠের গুঁড়া বা পাটের চট বিছিয়ে উপযুক্ত তাপমাত্রা নিশ্চিত করতে একশ ওয়াটের বাতি সংবলিত হোভার ব্যবহার করা হয়, যেখানে প্রতিটি হোভারে আড়াইশ থেকে তিনশ বাচ্চা রাখা যায়।

জীবনিরাপত্তা ও সঠিক টিকাদানই খামারের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। হাঁসের প্রধান দুটি ঘাতক ব্যাধি হলো ডাক প্লেগ ও ডাক কলেরা। বাচ্চার বয়স বিশ থেকে সাতাশ দিনের মধ্যে রানের মাংসে ডাক প্লেগ এবং দুই মাস বয়সে বুকের মাংসে সাবধানে ডাক কলেরা টিকা প্রয়োগ করতে হয়। প্রতিটি টিকার পনেরো দিন পর বুস্টার ডোজ দেওয়া এবং প্রতি ছয় মাস পর পর তা নিয়মিত নবায়ন করলে খামারে রোগবালাইয়ের ঝুঁকি শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব।