অক্টোবর ২২, ২০২৫, ০৬:৩৯ পিএম
বাংলাদেশে যখন মা ইলিশ রক্ষায় চলছে মাছ ধরার কঠোর নিষেধাজ্ঞা, ঠিক সেই সুযোগে দেশের সমুদ্রসীমায় ঢুকে ইলিশ ধরে নিয়ে যাচ্ছে ভারতীয় জেলেরা। এমন উদ্বেগজনক তথ্য জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। তিনি বলেছেন, বঙ্গোপসাগর যখন বাংলাদেশী জেলেদের জন্য ফাঁকা থাকে, সেই সুযোগে ভারতীয় জেলেরা বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশ করে ইলিশ মাছ ধরে নিয়ে যায়।
বুধবার দুপুরে সাভারের বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটে (বিএলআরআই) আয়োজিত এক কর্মশালা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই গুরুতর বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি আশ্বস্ত করেন, বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গেই সরকার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং দেশের সামুদ্রিক সম্পদ রক্ষায় কোস্টগার্ডকে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সাগরে বাংলাদেশের জলসীমায় ভারতীয় জেলেরা ইলিশ মাছ ধরতে আসে তা জানার পরই সাথে সাথে কোস্টগার্ডকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এবং ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
আমরা চাই দেশের মানুষ ইলিশ খাবে, সাগরে যেন কেউ চুরি করে মাছ ধরতে না পারে সেজন্য সরকার ব্যবস্থা নিয়েছে।ইলিশ নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে উপদেষ্টা ফরিদা আখতার কেবল বাইরের দেশের জেলেদের দোষারোপ করেননি, বরং দেশের অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জগুলোও স্বীকার করেছেন। নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও দেশের বিভিন্ন স্থানে গোপনে ইলিশ ধরা ও বাজার বসার খবরের সত্যতা তিনি স্বীকার করেন।
তিনি বলেন, এই প্রবণতা বন্ধে সরকার ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। তবে এই প্রচেষ্টা চালাতে গিয়ে মাঠ পর্যায়ে বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। উপদেষ্টা জানান, দেশের একাধিক স্থানে অবৈধ জেলেদের হামলার শিকার হতে হয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের, যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের কাজটিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। এর পাশাপাশি তিনি এই নিষেধাজ্ঞার আর্থ-সামাজিক সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেন। ফরিদা আখতার স্বীকার করেন যে, নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের পুনর্বাসনের জন্য যে সহায়তা দেওয়া হয়, তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়।
তিনি বলেন, সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা সকল জেলের জন্য পর্যাপ্ত চালের ব্যবস্থা করতে পারিনি। এই ঘাটতির কারণেই হয়তো অনেক জেলে পেটের দায়ে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ ধরতে বাধ্য হচ্ছেন।বুধবারের এই অনুষ্ঠানটি ছিল বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের বার্ষিক গবেষণা পর্যালোচনা কর্মশালার উদ্বোধনী। সাভারে বিএলআরআইয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এই কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক ড. শাকিলা ফারুক।
অনুষ্ঠানে উপদেষ্টা ফরিদা আখতার ছাড়াও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মো. জাহের এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. আবু সুফিয়ানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। কর্মশালায় মূল বক্তব্য প্রদানকালে উপদেষ্টা ফরিদা আখতার দেশের প্রাণিসম্পদ খাতের গবেষণার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বিজ্ঞানীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার সময় অবশ্যই প্রান্তিক মানুষের কথা এবং গ্রামের মহিলাদের কথা ভাবতে হবে।
তিনি বিশেষ করে গ্রামীণ মুরগির উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দেন, যা গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনে সহায়ক হবে।গবেষণার পাশাপাশি প্রাণিখাদ্যের নিরাপত্তা নিয়েও তিনি তীব্র হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। গবাদি পশুর খাদ্যে যারা ট্যানারি বর্জ্য ব্যবহার করে, তাদের ‘দেশের শত্রু’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন উপদেষ্টা। তিনি বলেন, এই সকল উপাদানে অত্যাধিক মাত্রায় ক্ষতিকর ক্যামিকেল পাওয়া গেছে, যা মানুষের শরীরে ক্যান্সার রোগসহ বিভিন্ন মারাত্মক রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
তিনি এই ভয়াবহ অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দেন। অনুষ্ঠানে মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মো. জাহের গবেষণার প্রায়োগিক দিকের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, গবেষণা কাজে বাজেট বাড়ানোর জন্য বরাবরই দাবি তোলা হয়, কিন্তু গবেষণা সাধারণ মানুষের কী উপকারে আসে তা সবার আগে দেখতে হবে। যদি গবেষণার সুফল সাধারণ মানুষ না পায়, তবে বাজেট কমাতেও হতে পারে। তিনি বাজারে ডিম, মুরগি ও গরুর মাংসের উচ্চমূল্যের কথাও উল্লেখ করেন। সচিব বলেন, ডিম, মুরগি, গরুর মাংসের দাম বেশি—এই কথা সর্বদা শুনতে হয়।
তবে একথাও ভাবতে হবে যে, আমাদের দেশে খাবারের (পশুখাদ্যের) দামও বেশি। তার এই বক্তব্য উপদেষ্টার পশুখাদ্য সংকটের উদ্বেগকেই সমর্থন করে, যা পরোক্ষভাবে বাজারে আমিষের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।




দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন