অক্টোবর ২২, ২০২৫, ০৭:৩০ পিএম
বিশ্বের মূল্যবান ধাতুর বাজারে স্বর্ণের দাম নিয়ে তীব্র অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিনিয়োগকারীরা যখন নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে স্বর্ণের ওপর আস্থা রাখছেন, ঠিক সেই সময়েই বাজার চরম রদবদলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মঙ্গলবার ইতিহাসের অন্যতম বড় দরপতনের সাক্ষী হওয়ার পর এক দিন না যেতেই বুধবার বাজার খোলার সঙ্গে সঙ্গেই স্বর্ণের দাম আবারও বাড়তে শুরু করে। তবে এই ঊর্ধ্বগতি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি; দিনের লেনদেনের শেষ দিকে তা আবারও পতনের ধারায় ফিরে আসে।
এই ঘটনা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ এবং একই সাথে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে স্বর্ণের দাম প্রতি আউন্সে চার হাজার ডলারের বিস্ময়কর মনস্তাত্ত্বিক সীমা অতিক্রম করে লেনদেন হচ্ছে।চলতি সপ্তাহের শুরুটা স্বর্ণের বাজারের জন্য ছিল ভয়াবহ। গত মঙ্গলবার বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে আকস্মিক ধস নামে। একদিনেই দাম ৫ শতাংশের বেশি কমে গিয়েছিল, যা ২০২০ সালের আগস্ট মাসের পর থেকে দৈনিক সবচেয়ে বড় পতনের রেকর্ড।
ওই সময় স্বর্ণের দাম প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৩ দশমিক ৩৯ ডলার পর্যন্ত নেমে গিয়েছিল, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্কের সঞ্চার করে। কিন্তু এই বড় পতনের জের কাটতে না কাটতেই বুধবার বাজার ভিন্ন আচরণ শুরু করে। রয়টার্স জানায়, বুধবার লেনদেনের শুরুতে স্পট গোল্ডের দাম শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ১৩৪ দশমিক ৩৭ ডলারে দাঁড়িয়েছিল। একই সময়ে, ডিসেম্বরের জন্য নির্ধারিত ইউএস গোল্ড ফিউচারের দামও প্রায় ১ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ১৪৭ দশমিক ১০ ডলারে লেনদেন হয়।
এই বৃদ্ধি বিনিয়োগকারীদের নতুন করে আশাবাদী করে তুলেছিল।তবে এই স্বস্তি ছিল ক্ষণস্থায়ী। রয়টার্সের সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, বাজারের এই ঊর্ধ্বগতি ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। দিনের পরবর্তী সময়ে স্পট গোল্ডের প্রতি আউন্সের দাম আগের দিনের চেয়ে উল্টো ১ দশমিক ৪ শতাংশ কমে ৪ হাজার ৬৭ ডলারে নেমে আসে। এই মূল্য গত দুই সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন, যা বাজারের ভঙ্গুর অবস্থাকেই স্পষ্ট করে। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, এই অস্বাভাবিক অস্থিরতার পেছনে দুটি প্রধান কারণ কাজ করছে।
প্রথমত, মার্কিন ডলারের দাম কমে যাওয়া। ডলার দুর্বল হয়ে পড়লে অন্যান্য মুদ্রা ব্যবহারকারী দেশগুলোর বিনিয়োগকারীদের জন্য স্বর্ণ কেনা তুলনামূলকভাবে সস্তা হয়ে পড়ে, যা সাময়িকভাবে চাহিদা বাড়িয়ে দেয়। দ্বিতীয় এবং প্রধান কারণটি হলো, মঙ্গলবারের ঐতিহাসিক দরপতনের পর অনেক বিনিয়োগকারী এই কম দামকে ‘সস্তায় কেনার সুযোগ’ বা ‘বারগেইন হান্টিং’ হিসেবে লুফে নিয়েছেন। তারা কম দামে সোনা কিনে মজুদ করতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন, যা বুধবারের প্রাথমিক মূল্যবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।
বাজার বিশ্লেষক রোনা ও’কনেল বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, মঙ্গলবারের এই মূল্য সংশোধন বা দরপতন অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল। তার মতে, বাজারটি ‘অনেক বেশি ক্রয় করা হয়েছিল’ অর্থাৎ বাস্তবতার চেয়ে বেশি দামে লেনদেন হচ্ছিল, যা একটি কৃত্রিম বুদবুদের মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। তাই এই পতন বাজারকে কিছুটা স্থিতিশীল করেছে। তিনি আরও বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক বাজারের অনিশ্চয়তা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ কর্তৃক সুদের হার কমানোর যে জোরালো প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তার কারণে বিনিয়োগকারীরা এই দাম কমাকে ভয় না পেয়ে বরং নতুন করে কেনার সুযোগ হিসেবেই দেখছেন।
অর্থাৎ, দীর্ঘমেয়াদে স্বর্ণের দাম বাড়বে, এই বিশ্বাস থেকেই তারা কম দামে বিনিয়োগ করছেন।স্বর্ণের পাশাপাশি রুপার বাজারেও একই ধরনের চরম অস্থিরতা দেখা গেছে। মঙ্গলবার রুপার দাম একদিনেই ৭ দশমিক ১ শতাংশ ধস নেমেছিল। বুধবার তা কিছুটা সামলে নিয়ে শূন্য দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৪৮ দশমিক ৮৪ ডলারে উঠেছে। বর্তমানে সকল বিনিয়োগকারীর চোখ শুক্রবার প্রকাশিত হতে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা মূল্য সূচক বা সিপিআই প্রতিবেদনের দিকে।
এই প্রতিবেদনটি দেশটির মূল্যস্ফীতির চিত্র তুলে ধরবে। যদি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তবে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কমাতে আরও উৎসাহিত হবে। সুদের হার কমলে ডলার ও বন্ডের মতো সম্পদগুলোর আকর্ষণ কমে যায় এবং এর ফলে সুদমুক্ত সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের দাম সাধারণত বৃদ্ধি পায়। তাই এই সিপিআই প্রতিবেদনের ওপরই নির্ভর করছে স্বর্ণের বাজারের পরবর্তী গতিপ্রকৃতি।




দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন