সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬, ০১:০৭ পিএম
পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার আটঘর কুড়িয়ানায় বর্ষা মৌসুমে জমে উঠেছে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী ভাসমান নৌকার হাট। মৌসুমে প্রায় ১০ কোটি টাকার নৌকা বেচাকেনা হলেও শেড, নিরাপদ ঘাট, সুপেয় পানি, স্যানিটেশন ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তার অভাবে চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন ব্যবসায়ী, ক্রেতা ও দর্শনার্থীরা।
বৃষ্টিতে ভিজে কিংবা তীব্র রোদে পুড়ে কেনাবেচা চলে খালের পানিতে। নেছারাবাদ উপজেলার আটঘর কুড়িয়ানা খালে বর্ষাকালে শাপলা ফুলের মতো সারি সারি নৌকার সমারোহ দেখা যায়। আশপাশের খাল দিয়ে কোনো ইঞ্জিনচালিত ট্রলার বা নৌযান গেলে পানির ঢেউয়ে দোলে শত শত নৌকা। আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র ও আশ্বিন—এই চার মাস হাটে সবচেয়ে বেশি কেনাবেচা হয়। তবে সারা বছরই কমবেশি ক্রয়বিক্রয় চলে। প্রতি সপ্তাহের সোম ও শুক্রবার হাট বসলেও শুক্রবার এটি জমজমাট রূপ নেয়। কয়েক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে এই কেনাবেচা।
দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিকাজে ব্যবহৃত ছোট ডিঙি নৌকার অন্যতম প্রধান উৎস এই হাট। বছরে একবার ব্যবহারের উপযোগী এসব নৌকা কিনতে বরিশাল, বাকেরগঞ্জ, ঝালকাঠি, নলছিটি, বানারীপাড়া, নাজিরপুর, উজিরপুর, কাঠালিয়া, রাজাপুর, গোপালগঞ্জ ও বৈঠাকাটাসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ আসেন। বিশেষ করে বর্ষাকালে নিচু জমিতে ঘাস কাটা, ঘেরে মাছ শিকার এবং পেয়ারা ও আমড়া তোলার কাজে এই নৌকাগুলোর ব্যাপক চাহিদা থাকে। উজিরপুর থেকে আসা ক্রেতা সবুজ হাওলাদার জানান, গরু-ছাগলের ঘাস কাটা এবং মাছ ধরার জন্য তিনি হাটে আসেন। এবার দাম কিছুটা বেশি হলেও তিনি আট হাজার ৫০০ টাকায় দুটি নৌকা কিনেছেন। তবে হাটে হঠাৎ বৃষ্টি নামলে আশ্রয় নেওয়ার মতো কোনো স্থায়ী ছাউনি বা শেড না থাকায় তাকে ভিজতে হয়েছে। নৌকা বিক্রেতা আব্দুল কাইয়ুম ও গোলাম রসুল জানান, শত বছরের পুরোনো এই বাজারে প্রায় ছয় মাস নৌকার জোয়ার থাকে। কিন্তু নৌকা ওঠানামা করানোর কোনো পাকা ঘাট নেই। বৃষ্টির সময় ক্রেতা-বিক্রেতাদের দাঁড়ানোর জায়গা না থাকায় খোলা আকাশের নিচেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। ব্যবসায়ীরা অবিলম্বে বিশুদ্ধ পানি, শৌচাগার ও একটি সুরক্ষিত শেড নির্মাণের জোর দাবি জানিয়েছেন।
পর্যটকদের উপস্থিতিও হাটের অন্যতম বড় দিক হলেও অবকাঠামোগত ঘাটতি স্পষ্ট। সাহারিয়ার কিঞ্জাল নামের এক দর্শনার্থী জানান, বর্ষায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে বহু মানুষ এলেও হাটে মোটরসাইকেল রাখার মতো কোনো নিরাপদ গ্যারেজ বা স্থান নেই। যেকোনো সময় যান চুরির আশঙ্কা থাকে। এছাড়া দূরদূরান্ত থেকে আসা পর্যটকদের জন্য কোনো মানসম্মত খাবার হোটেল বা রেস্তোরাঁ গড়ে ওঠেনি। হাটের ইজারাদার আবুল বাশার জানান, প্রতিটি হাটে প্রায় দুইশত নৌকা বিক্রি হয়। চার মাসের ভরা মৌসুমে প্রতিবছর প্রায় ১০ কোটি টাকার নৌকা কেনাবেচা হয়ে থাকে। বিপুল এই বাণিজ্যিক লেনদেনের পরও প্রশাসনিক পর্যায়ে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সুবিধার জন্য কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। জেলা ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আহসানুল কবির জানান, ব্যবসায়ী নেতারা ভাসমান হাট পরিদর্শন করেছেন। ক্রেতা-বিক্রেতাদের দীর্ঘদিনের কষ্ট লাঘবে জেলা পরিষদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সরকারি অনুদান পাওয়ার চেষ্টা চলছে। অনুদান বরাদ্দ পেলে ব্যবসায়ীদের বৃষ্টি ও রোদ থেকে বাঁচাতে একটি স্থায়ী শেড নির্মাণ করা হবে।
স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই ভাসমান নৌকার হাটে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে এটি দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ পর্যটন কেন্দ্রে রূপ নিতে পারে। এতে আটঘর কুড়িয়ানা এলাকার বেকার তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন