অক্টোবর ৫, ২০২৬, ১২:৫৬ পিএম
প্যারালাইসিস, স্ট্রোক কিংবা জটিল স্নায়বিক রোগের কারণে শারীরিক বাকশক্তি হারানো রোগীদের মনের অব্যক্ত ভাবনাকে শব্দে রূপ দেওয়ার এক যুগান্তকারী প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন আন্তর্জাতিক গবেষকরা। রোগীর কথা বলার শারীরিক ক্ষমতা বিনষ্ট হলেও মস্তিষ্কে ভাষা বা ভাবনার প্রক্রিয়াটি সচল থাকে। সেই অদৃশ্য ভাবনাকে বাস্তব বাক্যে রূপ দিতে নতুন সম্ভাবনা হিসেবে দেখা দিয়েছে ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস বা বিসিআই প্রযুক্তি, যেখানে মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম বৈদ্যুতিক স্পন্দন বিশ্লেষণ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) সহায়তায় বাস্তব কথার ধ্বনি পুনর্নির্মাণ করা হচ্ছে।
এই আধুনিক চিকিৎসা-প্রযুক্তির মূল ভিত্তি হলো মানুষ যখন কোনো শব্দ উচ্চারণ করতে চায়, তখন তার মস্তিষ্কে যে নির্দিষ্ট বৈদ্যুতিক তরঙ্গ তৈরি হয় তা নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা। এজন্য মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশে অত্যন্ত ক্ষুদ্র ইলেকট্রোড স্থাপন করা হয়, যা স্নায়ুকোষের সংকেত সংগ্রহ করে বাইরের তথ্যপ্রক্রিয়াকরণ কম্পিউটারে পাঠায়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্যারাড্রোমিক্সের সংযুক্ত বিসিআই ডিভাইসে রয়েছে ৪২১টি বিশেষ মাইক্রোইলেকট্রোড। এই ইলেকট্রোডগুলো রোগীর কথা বলা এবং শারীরিক নড়াচড়ার সঙ্গে যুক্ত মস্তিষ্কের সুনির্দিষ্ট স্নায়বিক কার্যকলাপ নিখুঁতভাবে ধরতে পারে। এর মাধ্যমে রোগী মুখে শব্দ উচ্চারণ করতে না পারলেও তার ভেতরের প্রচেষ্টা স্পষ্ট সংকেত আকারে যন্ত্রে ধরা পড়ে। সংকেত সংগ্রহ করার পর মূল কাজটি সম্পন্ন করে মেশিন লার্নিং (Machine Learning) ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নত মডেল।
রোগী যখন মনে মনে বিভিন্ন শব্দ বা বাক্য বলার চেষ্টা করেন, তখন মস্তিষ্কে তৈরি হওয়া তরঙ্গের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শব্দের পারস্পরিক সম্পর্ক ডিজিটালভাবে নথিভুক্ত করা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে সংগৃহীত বিপুল উপাত্ত দিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেলকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এভাবে অনুশীলনের মাধ্যমে কম্পিউটার শিখতে পারে কোন ধরনের বৈদ্যুতিক সংকেত মূলত কোন নির্দিষ্ট ধ্বনি বা শব্দের সঙ্গে যুক্ত। পরবর্তীতে রোগী পুনরায় কথা বলার চেষ্টা করলেই সেই স্নায়ু সংকেত তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্লেষণ করে কম্পিউটার স্বয়ংক্রিয়ভাবে কথার স্পষ্ট ধ্বনি তৈরি করে।
গত ২০২৫ সালের একটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় মস্তিষ্কের স্নায়বিক সংকেত প্রতি ৮০ মিলিসেকেন্ড অন্তর বিশ্লেষণ করে প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে মানুষের মুখের ভাষা তৈরির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়।
এই প্রযুক্তির আরেকটি বৈপ্লবিক দিক হলো তারবিহীন বা ওয়্যারলেস যোগাযোগ ব্যবস্থা। অতীতের বহু ডিভাইসে মস্তিষ্কে বসানো সেন্সর থেকে বাইরে থাকা কম্পিউটারে তারের সংযোগ দিতে হতো, যার ফলে রোগীকে সারাক্ষণ যন্ত্রের সঙ্গে শারীরিকভাবে আবদ্ধ থাকতে হতো। আধুনিক সংযুক্ত বিসিআই ব্যবস্থায় মস্তিষ্ক থেকে পাওয়া সংকেত প্রথমে রোগীর বুকের ভেতরে থাকা একটি ছোট ট্রান্সসিভারে পৌঁছায়। সেখান থেকে তারবিহীন পদ্ধতিতে সংকেত পাঠানো হয় বাইরের রিসিভারে, যা রোগীর দৈনন্দিন স্বাভাবিক চলাফেরাকে সহজ করে তোলে।
চলতি ২০২৬ সালে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা মানুষের শরীরে এই সমন্বিত ডিভাইস প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে প্রযুক্তিটির পরীক্ষামূলক প্রয়োগে নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছেন।গবেষকরা জানিয়েছেন, পুরো উদ্ভাবনটি বর্তমানে মানুষের ওপর ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রাথমিক ধাপে রয়েছে। ফলে সাধারণ রোগীদের জন্য এখনই এটি কোনো প্রচলিত বা বাজারে সহজলভ্য নিয়মিত চিকিৎসা নয়। তবে মুখ দিয়ে উচ্চারণ করার শারীরিক ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা মানুষের জন্য এই উদ্ভাবন ভবিষ্যতে স্বাধীন যোগাযোগের সবচেয়ে বড় অবলম্বন হয়ে উঠতে পারে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন