সোমবার, ০৫ অক্টোবর, ২০২৬,

হাসানুল হক ইনুর মৃত্যুদণ্ড চেয়ে প্রসিকিউশনের আপিল

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ৫, ২০২৬, ০১:২৩ পিএম

হাসানুল হক ইনুর মৃত্যুদণ্ড চেয়ে প্রসিকিউশনের আপিল

ছবি: সংগৃহীত

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যাসহ আটটি অভিযোগে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুর মৃত্যুদণ্ড চেয়ে আপিল করেছে প্রসিকিউশন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন দল রোববার (৪ অক্টোবর) বেলা সাড়ে এগারোটার দিকে আপিল বিভাগে এই আনুষ্ঠানিক আবেদন দাখিল করে। এর আগে বিচারিক আদালত ইনুকে দশ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল।

গত ৩০ জুন ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল ইনুকে এই দণ্ডাদেশ দেন। একই সাথে দুটি অভিযোগে তাকে এক লাখ টাকা করে মোট দুই লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

প্রসিকিউশনের আনা আটটি অভিযোগের মধ্যে তিন নম্বর অভিযোগে ইনুকে দশ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া ছয় ও সাত নম্বর অভিযোগে যথাক্রমে এক লাখ টাকা করে জরিমানা এবং উভয় অভিযোগে দশ বছর করে কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। তবে এক, দুই, চার, পাঁচ ও আট নম্বর অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেয় আদালত। ট্রাইব্যুনালের নির্দেশে আলাদা আলাদা সাজার মেয়াদ একসঙ্গে চলার কারণে তাকে কার্যকরভাবে দশ বছরের সাজা ভোগ করার আদেশ দেওয়া হয়েছিল। এই সাজাকে অপর্যাপ্ত দাবি করে সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়েছে প্রসিকিউশন।

প্রসিকিউশনের বিবরণ অনুযায়ী ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ওই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর প্রধান প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই শেষে ২৫ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র বা ফরমাল চার্জ দাখিল করে প্রসিকিউশন। ওই দিনই অভিযোগ আমলে নিয়ে ইনুর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে ট্রাইব্যুনাল-২। পরবর্তীকালে উভয় পক্ষের দীর্ঘ শুনানি শেষে ২ নভেম্বর সুনির্দিষ্ট আটটি অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরুর নির্দেশ আসে।

গত বছরের ৩০ নভেম্বর এ মামলায় প্রসিকিউশন তাদের সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করে। ১ ডিসেম্বর থেকে শুরু হয় আনুষ্ঠানিক সাক্ষ্যগ্রহণ। তদন্ত কর্মকর্তাসহ ইনুর বিরুদ্ধে মোট দশজন সাক্ষী জবানবন্দি দেন। এর মধ্যে তিনজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী, দুজন বিশেষজ্ঞ, ভুক্তভোগী পরিবারের একজন, দুজন জব্দতালিকার সাক্ষী, একজন কারারক্ষী এবং একজন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন। আসামিপক্ষে দুজনের সাফাই সাক্ষ্য নেওয়া হয়। এ ছাড়া আদালতে বিশ সিরিজের নথিপত্র এবং পাঁচটি বস্তুগত আলামত প্রদর্শনী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে চলতি বছরের ২ এপ্রিল যুক্তিতর্ক শুরু হয়। আসামিপক্ষের যুক্তিখণ্ডন ও প্রসিকিউশনের পাল্টা যুক্তি উপস্থাপন পর্ব শেষ হয় ১৪ মে। ওই দিনই আদালত মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখে এবং পরে ২২ জুন রায় ঘোষণার দিন ঠিক করা হয়।

প্রসিকিউশনের অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ভারতের একটি গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আন্দোলনকারীদের চরমপন্থি ও সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের উসকানি দেন ইনু। ১৯ জুলাই রাতে গণভবনে তৎকালীন সরকারপ্রধানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত চৌদ্দ দলীয় জোটের বৈঠকে নিরীহ ছাত্র-জনতাকে দমনে সরাসরি গুলির নির্দেশ কার্যকর করার ক্ষেত্রে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

অভিযোগে আরও বলা হয়, ২০ জুলাই দুপুরে ইনু তার নিজ জেলা কুষ্টিয়ার তৎকালীন পুলিশ সুপারকে ফোনে নির্দেশ দিয়ে আন্দোলনকারীদের ছবি দেখে তালিকা তৈরির নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন স্থানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দলীয় ক্যাডাররা সাধারণ মানুষের ওপর নির্বিচার গুলি চালায়। এতে শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী এবং চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ নিহত হন। আহত হন বহু মানুষ।

এ ছাড়া মারণাস্ত্র ব্যবহার, হেলিকপ্টার থেকে গুলি, ছত্রীসেনা মোতায়েন ও কারফিউ জারির মাধ্যমে হত্যাকাণ্ড সংঘটনের পরিকল্পনায় ইনুর প্রত্যক্ষ সমর্থন ও উসকানি ছিল বলে প্রসিকিউশনের আর্জিতে উল্লেখ করা হয়। ২৯ জুলাইয়ের বৈঠকে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দিয়ে সহিংসতাকে বৈধতা দেওয়া এবং ৪ আগস্ট সরকার পতনের আগের দিনও দমনপীড়নের পক্ষে সমর্থন জানানোর তথ্য তুলে ধরে প্রসিকিউশন তার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের আবেদন জানিয়েছে।