রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

তার থেকে তরঙ্গ: যোগাযোগ প্রযুক্তির রূপান্তর

তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক

নভেম্বর ১০, ২০২৫, ০৪:২১ পিএম

তার থেকে তরঙ্গ: যোগাযোগ প্রযুক্তির রূপান্তর

তথ্য-প্রযুক্তি খাতে মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থার যে বিস্ময়কর রূপান্তর ঘটেছে, তা শুরু হয়েছিল তারের হাত ধরে, আর আজ তা পৌঁছেছে অদৃশ্য তরঙ্গের শিখরে। এই যাত্রা কেবল একটি প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নয়, এটি মানুষের সমাজ, সংস্কৃতি ও সম্পর্কের ধরনে এক গভীর বিপ্লব এনেছে।

১৮৩৭ সালে আমেরিকান উদ্ভাবক স্যামুয়েল মর্স ইলেকট্রিক টেলিগ্রাফ আবিষ্কার করেন। বিন্দু আর দাগের সমন্বয়ে তৈরি মর্স কোড হয়ে ওঠে প্রথম বৈদ্যুতিক ভাষা। ১৮৪৪ সালে ওয়াশিংটন থেকে বাল্টিমোরে পাঠানো ইতিহাসের প্রথম বার্তা ‘What hath God wrought!’-এর মাধ্যমে এক নতুন যুগের সূচনা হয়।

টেলিগ্রাফ শুধু খবর ছড়ানোর গতিই বাড়ায়নি, ব্যবসা-বাণিজ্যে দ্রুততা আনে এবং যুদ্ধক্ষেত্রে কমান্ড পৌঁছে দেয় মুহূর্তে। ভারতেও ব্রিটিশরা তাদের শাসনব্যবস্থায় টেলিগ্রাফকে ব্যবহার করেছিল, যা প্রমাণ করে প্রযুক্তি তখন থেকেই ক্ষমতার একটি অপরিহার্য হাতিয়ার হয়ে ওঠে।

টেলিগ্রাফের পর ১৮৭৬ সালে আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল আবিষ্কার করেন টেলিফোন। একটি তারের মধ্য দিয়ে মানুষের কণ্ঠস্বর অন্য প্রান্তে ছুটে যাওয়ায় যোগাযোগে যুক্ত হয় ব্যক্তিগত ছোঁয়া। চিঠির নিস্তব্ধতা ভেঙে সেখানে যোগ হয় শব্দ, আবেগ ও মানুষের উপস্থিতি। ২০ শতকের শুরুতে শহর থেকে শহর টেলিফোন লাইন ছড়িয়ে পড়লে মানুষ বুঝতে পারে সংযোগ মানেই ক্ষমতা।

বাণিজ্য, রাজনীতি ও কূটনীতি সব ক্ষেত্রেই টেলিফোন অপরিহার্য হয়ে ওঠে।বিশ শতকের গোড়ায় জন্ম নেয় রেডিও, যেখানে মানুষ প্রথমবার তারবিহীন যোগাযোগের স্বাদ পায়। ১৯২০ সালে পেনসিলভেনিয়ার পিটসবার্গ শহরে চালু হয় প্রথম বাণিজ্যিক রেডিও সম্প্রচার। সংবাদ, সংগীত, নাটক সরাসরি মানুষের কানে পৌঁছাতে শুরু করে। রেডিওর পথ ধরে আসে টেলিভিশন, যা যোগাযোগকে সম্পূর্ণ নতুন মাত্রায় নিয়ে যায়।

মানুষ শুধু শোনেই না, দেখেও। এই দৃশ্যমান পরিবর্তন সমাজে এনে দেয় এক নতুন সত্যের বিশ্বাস। চাঁদে মানুষের পা রাখা থেকে শুরু করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সংবাদ পর্যন্ত সব মুহূর্ত পৌঁছে যায় ঘরে ঘরে। এই সময়েই জন্ম নেয় গণমাধ্যমের চূড়ান্ত ক্ষমতা—যেখানে তথ্য শুধু পণ্য নয়, প্রভাবের এক শক্তিশালী অস্ত্র।১৯৬২ সালে আমেরিকার TELSTAR স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের পর পৃথিবী সত্যিই এক ‘গ্লোবাল ভিলেজ’-এ পরিণত হয়। তখন থেকে খবর, কণ্ঠ ও চিত্র এক মুহূর্তে অতিক্রম করতে শুরু করে মহাদেশের সীমা।

লাইভ টেলিভিশন সম্প্রচার, আন্তর্জাতিক ফোনকল—সবই সম্ভব হলো স্যাটেলাইট প্রযুক্তির কারণে। এই সময়টুকুই ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিয়েছিল যে, যোগাযোগ শুধু বার্তা পরিবহন নয়, বরং বিশ্বায়নের যাত্রা।১৯৬৯ সালে মার্কিন প্রতিরক্ষা সংস্থা ARPA চালু করে পরীক্ষামূলক নেটওয়ার্ক ARPANET। এটাই ছিল আজকের ইন্টারনেটের যাত্রা। ১৯৮০ ও ৯০-এর দশকে টিম বার্নার্স-লি তৈরি করেন World Wide Web আর শুরু হয় তথ্যের গণতন্ত্রীকরণ। ইন্টারনেটের আবির্ভাবে মিডিয়া তার একচ্ছত্র আধিপত্য হারায়। জন্ম নেয় ব্লগ, ই-মেইল, সোশ্যাল নেটওয়ার্ক।

যোগাযোগ দ্বিমুখী হয়—সবাই তথ্য স্রষ্টা ও ভোক্তা দুই-ই। আজ রাজনীতি থেকে ব্যবসা, প্রতিবাদ থেকে প্রেম—জীবনের কোনো ক্ষেত্রই ডিজিটাল সংযোগ ছাড়া অক্ষত নেই।২০০৭ সালে অ্যাপলের আইফোন বাজারে আসার পরই যোগাযোগ পেল নতুন রূপ। ইন্টারনেট, ক্যামেরা, জিপিএস, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সব এক যন্ত্রে এসে গেল। স্মার্টফোন আর মোবাইল ইন্টারনেটের প্রভাবে মানুষ এখন আর তথ্য খোঁজে না, বরং তথ্যই মানুষকে খুঁজে নেয়। হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক, ইউটিউব—সবকিছুই যোগাযোগকে করে তুলেছে ব্যক্তিগত, তাৎক্ষণিক ও বহুস্তরীয়।

২০২০-এর পর থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) যোগাযোগ প্রযুক্তির পরবর্তী স্তর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এআই এখন কেবল বার্তা পাঠায় না, বরং বার্তা বোঝে, অনুবাদ করে এবং সৃষ্টিও করে। চ্যাটবট, ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট—এসবই মানুষ ও মেশিনের মেলবন্ধনের নতুন অধ্যায়। আমাদের পক্ষ থেকে হয়তো একদিন এআই এজেন্টই মিটিং করবে বা সিদ্ধান্ত নেবে। এটাই ‘communication automation’-এর যুগ, যেখানে প্রযুক্তি কেবল মাধ্যম নয়, স্বয়ং অংশগ্রহণকারীও বটে।

মানুষ দ্রুতগতির এই সংযোগে পেয়েছে শক্তি, কিন্তু হারিয়েছে ধৈর্য। একসময় সম্পর্ক টিকে থাকত চিঠির পাতায়, এখন তা ভেসে যায় নোটিফিকেশনের স্রোতে। আমরা আগের চেয়ে অনেক বেশি সংযুক্ত, কিন্তু হয়তো কম সংলগ্ন। প্রযুক্তি স্বাধীনতা দিয়েছে, কিন্তু এনেছে আসক্তিও। এটাই আধুনিক যোগাযোগের একটি গভীর দ্বন্দ্ব—যত বেশি সংযোগ, তত বেশি নিঃসঙ্গতা।