রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

হামে শিশু মৃত্যু, দায় এড়ানোর সুযোগ নেই বিএনপির

জাতীয় ডেস্ক

জুন ১৫, ২০২৬, ১২:১০ পিএম

হামে শিশু মৃত্যু, দায় এড়ানোর সুযোগ নেই বিএনপির

বাংলাদেশে শিশুদের মধ্যে হাম ছড়িয়ে পড়ার পর তিন মাস পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, হাম ও এই রোগের উপসর্গে সংক্রমণের সংখ্যা এরই মধ্যে ৮৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ৬৫২টি শিশু। এত বিপুল মৃত্যুর পেছনে মূলত সরকারের অব্যবস্থাপনাকেই দুষছেন দেশের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।রাজধানীসহ সারাদেশের হাসপাতালগুলোতে এখন রোগীর উপচে পড়া ভিড়।

সন্তানদের প্রাণ বাঁচাতে গত এক মাস ধরে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটছেন সালমা বেগম ও আব্দুল গণি দম্পতি। আড়াই বছর বয়সি প্রথম সন্তান ইব্রাহীমকে তারা বাঁচাতে পারেননি। প্রথমে জ্বর ও ঠান্ডা ছিল। পরে শ্বাসকষ্ট শুরু হলে তাকে একটি ক্লিনিকে এবং সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। তারপরও তিন সপ্তাহ আগে শিশুটি মারা যায়।

সেই শোক কাটার আগেই তাদের আট মাস বয়সি আরেক ছেলের শরীরেও একই লক্ষণ দেখা দিয়েছে। তীব্র জ্বর ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে শিশুটি এখন শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে ভর্তি। পেশায় দিনমজুর আব্দুল গণি জমানো টাকা শেষ করে এখন আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার করে চিকিৎসা চালাচ্ছেন।

একই হাসপাতালের আরেক বিছানায় মেয়ের সঙ্গে খেলছিলেন ফরিদপুর থেকে আসা সাইমা খান। শ্বাসকষ্ট নিয়ে ভর্তির পর শিশুটিকে তিন দিন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখতে হয়েছিল। আশপাশের বিছানায় অন্য শিশুদের মৃত্যু ও লাইফ সাপোর্টে যাওয়ার দৃশ্য দেখে একপর্যায়ে তিনি মেয়ের সুস্থ হওয়ার আশাই ছেড়ে দিয়েছিলেন। এখন শিশুটি স্বাভাবিকভাবে খাচ্ছে ও খেলছে।

ঢাকা মেডিকেল, মুগদা মেডিকেল ও বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে সবখানেই হামের ওয়ার্ডগুলো রোগীতে প্রায় কানায় কানায় পূর্ণ। তবে গত সপ্তাহ থেকে রোগীর চাপ কিছুটা কমতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন শিশু হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মো. আতিকুল ইসলাম। তিনি জানান, ঢাকার বাইরে থেকে অনেকেই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে আসছেন। আগে হামে আক্রান্ত হওয়া শিশুদের অনেকের নিউমোনিয়ার মতো জটিলতা দেখা দিচ্ছে। সময়মতো চিকিৎসা শুরু করতে না পারায় অনেক রোগী মারা যাচ্ছে। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালেই প্রায় ৩৬ জন মারা গেছে, যাদের বড় অংশ ঢাকার বাইরে থেকে আসা।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা চিকিৎসক বে-নজির আহমেদ বলেন, সরকারের অব্যবস্থাপনার কারণেই এত মৃত্যু হয়েছে। ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পরও দেশজুড়ে স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা জারি না করাটা সরকারের একটি বড় ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। তার মতে শুরুতেই মহামারি ঘোষণা করে সব ফ্রন্ট থেকে যুদ্ধ ঘোষণা করলে হাম এত দীর্ঘায়িত হতো না। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বাড়ানো এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দিলে প্রাণহানি অনেক কমানো যেত।

অব্যবস্থাপনার এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী চিকিৎসক এম এ মুহিত। তিনি জানান, রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণের ১৫ দিন পরই হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। সরকার দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আরো হাজার হাজার শিশুর মৃত্যু হতো বলে দাবি করেন তিনি।

এই প্রাদুর্ভাবের জন্য বিগত আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে দায়ী করছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের বর্তমান প্রশাসন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সম্প্রতি জানান, প্রতি চার বছর পরপর এমআর টিকার কর্মসূচি চালানোর কথা ছিল। কিন্তু ২০২০ সালের ডিসেম্বরের পর বিগত সরকারগুলো সেটি করেনি। তারই প্রভাব এখন সবার ওপর পড়ছে। পরিস্থিতি কেন এমন পর্যায়ে গেল, তা খতিয়ে দেখতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে একটি স্বাধীন তদন্ত করার অনানুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে সরকার।

বিশ্লেষকদের ধারণা, হাম ঘিরে জরুরি অবস্থা ঘোষণা না করার পেছনে রাজনৈতিক স্ট্যান্ড থাকতে পারে। মহামারি ঘোষণা করলে ব্যর্থতার দায় নিজেদের ঘাড়ে আসবে ভেবেই হয়তো সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চিকিৎসক বে-নজির আহমেদ মনে করেন, এটি একটি ভুল ধারণা। মহামারি ঘোষণা করে তড়িৎ ব্যবস্থা নিলে উল্টো সরকার প্রশংসিত হতো।

হাম পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে শক্তিশালী রোগপ্রতিরোধ বলয় গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছে সরকার। এ লক্ষ্যে দুই মাস আগে দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। তবে এখনো শতভাগ শিশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যেই হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করায় সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া আরো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা