সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬, ১০:০৬ পিএম
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় এবং কাদের অন্তর্ভুক্ত করে গঠিত হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে বিশেষ কমিটির চতুর্থ বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে তিনি এ কথা জানান। সংসদীয় কমিটি জানিয়েছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ও এর গঠনপদ্ধতি নিয়ে অংশীজনদের কাছ থেকে পাওয়া বিভিন্ন মতামত ও প্রস্তাবের ওপর আরও উন্মুক্ত পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
জনগণের জন্য সবচেয়ে উপযোগী যে প্রক্রিয়া জাতীয় সংসদ বিবেচনা করবে, শেষ পর্যন্ত সেটিই গ্রহণ করা হবে বলে উল্লেখ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত কমিটির চতুর্থ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক, ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন এবং কমিটির সদস্য মো. মাহমুদুল হক রুবেল।
এদিনের বৈঠকে টেলিভিশন চ্যানেল, ইলেকট্রনিক মিডিয়া, অনলাইন পোর্টাল, সংবাদ সংস্থা এবং বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিনিধি ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের কাছ থেকে মতামত নেওয়া হয়। এর আগে গত রোববার বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা সম্পন্ন করে কমিটি। অংশগ্রহণকারীদের পর্যাপ্ত সময় দিয়ে কথা শোনার সুবিধার্থে দুই দিনে এই মতামত গ্রহণের কাজ চালানো হয়েছে। বৈঠকে গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের দেওয়া সব লিখিত প্রস্তাব সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে সেগুলো বিশদভাবে পর্যালোচনা করা হবে।
মঙ্গলবারের আলোচনায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পাশাপাশি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও বিকেন্দ্রীকরণ, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা, সংবিধানের প্রস্তাবনা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির মতো মৌলিক বিষয়গুলো উঠে এসেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ উল্লেখ করেন, জুলাই জাতীয় সনদে এ সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবের পাশাপাশি কিছু ভিন্নমতও রয়েছে। এটি গঠনের ক্ষেত্রে কোন কোন পর্যায় অনুসরণ করা হবে, তা নিয়ে একাধিক বিকল্প প্রক্রিয়া পর্যালোচনার সুযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলসহ সংশ্লিষ্ট সকল মহলের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট লিখিত প্রস্তাব আহ্বান করা হয়েছে। পুরো উদ্যোগকে সর্বজনীন ও অংশগ্রহণমূলক করতে কমিটি বিরোধী দলসহ সব রাজনৈতিক দলকে আনুষ্ঠানিক আলোচনায় আসার তাগিদ দিয়েছে।
একক রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে বাংলাদেশে দুই কক্ষবিশিষ্ট সংসদের আদৌ প্রয়োজন আছে কি না, সে বিষয়ে বৈঠকে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। তবে জুলাই জাতীয় সনদে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট গঠনের বিষয়ে আগেই ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় কমিটি সেই সমঝোতার আলোকেই কাজ এগিয়ে নিতে চায়। ভবিষ্যতে সংসদে এ নিয়ে নতুন কোনো প্রস্তাব এলে তা স্বাধীনভাবে বিবেচনার সুযোগ থাকবে।
প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের সর্বোচ্চ মেয়াদ দশ বছর নির্ধারণের প্রস্তাব নিয়েও দীর্ঘ পর্যালোচনা হয়েছে। বৈঠকে কেউ কেউ মত প্রকাশ করেন যে কোনো ব্যক্তির প্রধানমন্ত্রীর পদে থাকার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া জনগণের গণতান্ত্রিক পছন্দের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। তবে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের সময় দশ বছরের এই সময়সীমা নির্ধারণের যে প্রস্তাব দিয়েছিল, দলটি সেই নীতিগত অবস্থান থেকে এখনো সরে আসেনি। জনগণ কোনো নেতাকে পুনরায় দায়িত্বে দেখতে চাইলে সেই সুযোগ রাখা উচিত বলে অভিমত এলেও, ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বৈরাচার বা কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠার পথ চিরতরে রুদ্ধ করতেই মূলত দুই মেয়াদের এই সীমা প্রস্তাব করা হয়েছে।
কমিটির সভাপতি স্পষ্ট করেন যে জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, কমিটি তা বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে কোনো দল সনদের বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করলে আলোচনার মাধ্যমে তা বিবেচনায় আনা হবে। বিশেষ কমিটি পর্যায়ক্রমে সংবিধান বিশেষজ্ঞ, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, বর্তমান ও সাবেক বিচারক, শিক্ষাবিদ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বসবে। একই সাথে বিগত সতেরো বছরে রাজনৈতিক নিপীড়ন ও গুমের শিকার পরিবার এবং জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবারের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও কথা বলা হবে।
বিভিন্ন অংশীজনের মতামত সমন্বয়ের পর সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নিয়ে একটি সমন্বিত প্রতিবেদন তৈরি করা হবে। সেই চূড়ান্ত প্রতিবেদন জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের পরই সংবিধান সংশোধনের আনুষ্ঠানিক বিল উত্থাপিত হবে। আইন পাসের প্রক্রিয়ায় সংসদের ভেতরে পর্যালোচনার পাশাপাশি সংসদের বাইরেও মতামত প্রকাশের সুযোগ থাকবে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাবেক সদস্য এবং সনদ প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখা ব্যক্তিদের সঙ্গেও কমিটি পর্যায়ক্রমে বসবে। জুলাই জাতীয় সনদের মূল ভিত্তি ছিল ছয়টি পৃথক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন, যার ওপর রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন কাজ করেছে। অন্যান্য সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনগুলো বর্তমান সংশোধন প্রক্রিয়ার বাধ্যতামূলক অংশ না হলেও, ভবিষ্যতে সরকার প্রয়োজন মনে করলে গণমাধ্যমের মতো নির্দিষ্ট খাতে নতুন কমিশন গঠন করে তাদের সুপারিশও বাস্তবায়ন করতে পারবে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন