রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

সরকারের সমালোচনা মানেই কি বিরোধিতা? যা বলে ইসলাম

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

এপ্রিল ২৭, ২০২৬, ১০:৫৭ এএম

সরকারের সমালোচনা মানেই কি বিরোধিতা? যা বলে ইসলাম

ইসলামে কল্যাণকামিতার দর্শন

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি বিশেষ বাস্তবতা পরিলক্ষিত হচ্ছে যেখানে সরকারের সমালোচনাকে প্রায়ই সরকারি দল বা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সমালোচনা হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে এই দুইয়ের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান। রাষ্ট্র ও সরকার মূলত একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো হিসেবে কাজ করে, অন্যদিকে সরকারদল হলো একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সত্তা। 

উদাহরণস্বরূপ, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ব্যক্তি হিসেবে এক পরিচয় বহন করলেও প্রশাসনিক পদে আসীন হলে তিনি একটি প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন করেন। 

ফলে তার প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের গঠনমূলক সমালোচনা মানেই তার ব্যক্তিগত বা পেশাগত বিরোধিতা নয়। একইভাবে সরকারের কার্যক্রমের যৌক্তিক সমালোচনা করা মানে রাষ্ট্রবিরোধিতা নয়, বরং এটি একজন সচেতন নাগরিকের দায়িত্বশীল চর্চা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক সমালোচনার মূল উৎস থাকে হিতাকাঙ্ক্ষা বা কল্যাণকামিতা। সরকার পরিচালনার বিভিন্ন নীতি, সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমের যথাযথ পর্যালোচনা রাষ্ট্রকে আরও স্বচ্ছ, কার্যকর এবং জবাবদিহিমূলক করে তুলতে সহায়তা করে। ইসলামে হিতাকাঙ্ক্ষা বা অন্যের কল্যাণ কামনার এই ধারণাটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও মৌলিক। ইসলামের দৃষ্টিতে জনকল্যাণ নিশ্চিত করা এবং শাসকের ভুলত্রুটি নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা করা একই দর্শনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইসলামী পরিভাষায় এই ধারণাকে ‘আন-নাসিহাত’ বলা হয়। 

নাসিহাত শব্দের সাধারণ অর্থ উপদেশ মনে হলেও এর গভীরতর অর্থ হলো আন্তরিক কল্যাণকামিতা, সংশোধনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা এবং সঠিক পথে পরিচালনার ঐকান্তিক চেষ্টা।ইসলামী শিক্ষায় নাসিহাতকে দ্বিনের মূল ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সহিহ মুসলিমের একটি হাদিস অনুযায়ী, মহানবী (সা.) বলেছেন যে দ্বিন হলো মূলত নাসিহাত বা কল্যাণকামিতা। সাহাবিদের প্রশ্নের জবাবে তিনি স্পষ্ট করেন যে এই কল্যাণকামিতা হতে হবে আল্লাহর জন্য, তাঁর কিতাবের জন্য, তাঁর রাসুলের জন্য, মুসলিম শাসকদের জন্য এবং সাধারণ জনগণের জন্য। 

এই হাদিসটি প্রমাণ করে যে, শাসকের প্রতি গঠনমূলক দিকনির্দেশনা প্রদান করা কোনো ষড়যন্ত্র বা বিরোধিতা নয়, বরং এটি দ্বিনেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একইভাবে সরকারের পক্ষ থেকেও জনগণের জন্য সঠিক পথনির্দেশনা প্রদান করা এই হিতাকাঙ্ক্ষার অন্তর্ভুক্ত। তাই সরকারি কার্যক্রমের পর্যালোচনাকে শত্রুতামূলক দৃষ্টিতে না দেখে হিতাকাঙ্ক্ষা ও নাসিহাতের আলোকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।তবে মনে রাখা প্রয়োজন যে, সব সমালোচনা ইসলামে হিতাকাঙ্ক্ষা হিসেবে গণ্য হয় না। গঠনমূলক সমালোচনার কিছু সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য থাকা আবশ্যক। প্রথমত, সমালোচনার মূল লক্ষ্য হতে হবে সংশোধন, কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করা নয়। 

কেবল ত্রুটি চিহ্নিত করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না, বরং সেই ত্রুটি কীভাবে সংশোধন করা যায় সে বিষয়ে কার্যকর দিকনির্দেশনা থাকাও জরুরি। এছাড়া সমালোচনার পাশাপাশি একটি বাস্তবসম্মত বিকল্প পদ্ধতির প্রস্তাব রাখা হলে তা অধিক গ্রহণযোগ্য ও ফলপ্রসূ হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ভাষা ও উপস্থাপনায় শালীনতা বজায় রাখা। ব্যক্তিগত আক্রমণ বা কুরুচিপূর্ণ ভাষা পরিহার করে জনকল্যাণকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে মতামত প্রকাশ করাই হলো প্রকৃত নাসিহাত।

একটি পরিণত ও আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্রব্যবস্থার লক্ষণ হলো ভিন্নমত ও যৌক্তিক সমালোচনাকে সম্মান জানানো। ইসলামে হিতাকাঙ্ক্ষা বা এই ধরনের অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা একটি সুস্থ ও জবাবদিহিমূলক কল্যাণমুখী রাষ্ট্র নির্মাণে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ তাজাম্মুল হকের বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে যে, সমালোচনাকে যখন জনকল্যাণের হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তখন সমাজে ভুলের পুনরাবৃত্তি ও অদক্ষতা হ্রাস পায়। ফলে একটি উন্নয়নশীল সমাজের জন্য স্বচ্ছতা ও হিতাকাঙ্ক্ষার এই চর্চা অব্যাহত রাখা অপরিহার্য। এটি কেবল নাগরিক অধিকারই নয়, বরং ধর্মীয় ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও একটি প্রশংসনীয় কাজ।