মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,
কোরআন তেলাওয়াতের ফজিলত

কোরআন তেলাওয়াতের ফজিলত ও আখেরাতের পুরস্কার

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬, ০৫:০৯ পিএম

কোরআন তেলাওয়াতের ফজিলত ও আখেরাতের পুরস্কার

সৃষ্টির ওপর স্বয়ং স্রষ্টার মর্যাদা যেমন অতুলনীয়, মানুষের তৈরি বা প্রচলিত সব বাণীর ওপর মহান আল্লাহর কালাম পবিত্র কোরআনের মর্যাদাও ঠিক তেমনই। ঐশী এই মহাগ্রন্থ তেলাওয়াত ও চর্চার মধ্যে নিহিত রয়েছে বান্দার অফুরান সওয়াব, কল্যাণ, রহমত, বরকত, অন্তরের অনাবিল প্রশান্তি এবং আত্মিক শক্তি। এতে যেমন বিশ্বমানবতার হেদায়েত ও মুক্তির সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে, তেমনই নিয়মিত পাঠে ঘোষিত হয়েছে পরকালীন বিপুল পুরস্কার। বান্দার জন্য মহান রবের সঙ্গে সরাসরি কথোপকথনের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হলো তাঁর এই পবিত্র কালাম পাঠ করা।

শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ সা.-এর উম্মতের শারীরিক পরিশ্রমের সুযোগ ও পার্থিব জীবনকালের ব্যাপ্তি পূর্ববর্তী উম্মতদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম হলেও তাঁদের সম্মান ও আমলের প্রতিদান বহুগুণ বেশি। আল্লাহ তায়ালা এই উম্মতকে দান করেছেন তাঁর নিজস্ব বাণী আল কোরআন। নবী হজরত মুসা আ. আল্লাহর সঙ্গে কথা বলার দুর্লভ সুযোগ পেতেন কেবল নির্ধারিত সময়ে। আর শেষ নবীর উম্মত যখনই ইচ্ছা করে, তখনই কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে কথা বলার অবারিত সুযোগ লাভ করে থাকে। চতুর্থ খলিফা হজরত আলী রা. স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, তাঁর মনে যখনই আল্লাহর সঙ্গে কথা বলার প্রবল ইচ্ছা জাগত, তখনই তিনি কোরআন তেলাওয়াত শুরু করতেন।

রমজান মাস ব্যতীত বছরের অন্যান্য সময়ে পূর্ণ কোরআন খতম করার মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। অথচ সামান্য সচেতন হলেই প্রাত্যহিক জীবনের কাজের ফাঁকে এটি নিয়মিত জারি রাখা সম্ভব। প্রতি ওয়াক্ত নামাজের আগে ও পরে কিংবা সকাল ও সন্ধ্যায় মাত্র দুই-চার পৃষ্ঠা করে তেলাওয়াত অব্যাহত রাখলে দুই থেকে তিন মাসের ব্যবধানে অন্তত একটি পূর্ণ কোরআন খতম সম্পন্ন করা যায়। এমনকি কর্মব্যস্ততার মধ্যেও পূর্বে মুখস্থ করা ছোট ছোট সুরা পাঠ করা সম্ভব। বর্তমান ডিজিটাল যুগে অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোনে কোরআনের অ্যাপ্লিকেশন নামিয়ে দেখে দেখে তেলাওয়াত করার আধুনিক সুবিধাও রয়েছে।

নিয়মিত কোরআন পাঠকারীর জন্য মৃত্যুর পরবর্তী জীবনে কবরের আযাব থেকে সুরক্ষার বিশেষ ঘোষণা রয়েছে। মহানবী সা. ইরশাদ করেছেন, কোনো ব্যক্তি নিয়মিত আল্লাহর কিতাব তেলাওয়াত করলে মৃত্যুর পর কবরে দাফনের সময় যখন ফেরেশতারা মাথার দিক থেকে শাস্তির উদ্দেশ্যে এগিয়ে আসে, তখন পঠিত কোরআন তাদের বাধা দেয়। যখন সামনের দিক থেকে শাস্তি আসে, তখন তার পার্থিব দান-সদকা প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায়। আর যখন পায়ের দিক থেকে ফেরেশতা আসে, তখন জীবদ্দশায় পায়ে হেঁটে মসজিদে যাওয়ার পুণ্যময় আমল তাকে সুরক্ষা প্রদান করে। আবু মুসা আশআরি রা. থেকে বর্ণিত হাদিসে কোরআন পাঠকারী ও অপাঠকের চারটি সুন্দর উপমা তুলে ধরেছেন রাসুলুল্লাহ সা.। তিনি জানান, কোরআন পাঠকারী মুমিনের দৃষ্টান্ত হলো রসাল কমলার মতো, যার সুঘ্রাণ যেমন চমৎকার, তেমনই তার স্বাদও অত্যন্ত উত্তম। কোরআন তেলাওয়াত না করা মুমিনের উদাহরণ হলো সাধারণ খেজুরের মতো, যার স্বাদ মিষ্টি কিন্তু নিজস্ব কোনো ঘ্রাণ নেই। আবার কোরআন পাঠকারী পাপাচারী ব্যক্তির উপমা সুগন্ধিযুক্ত ফুলের মতো, যার সুবাস চমৎকার হলেও স্বাদ অত্যন্ত তেতো। অন্যদিকে কোরআন তেলাওয়াত না করা পাপী মানুষের দৃষ্টান্ত হলো বুনো মাকাল ফলের মতো, যা দেখতে আকর্ষণীয় মনে হলেও আসলে বিষাক্ত, দুর্গন্ধময় ও অত্যন্ত তিক্ত।

পরকালে জান্নাতের সুউচ্চ স্তর নির্ধারণে কোরআন পাঠের ব্যাপ্তি সরাসরি ভূমিকা রাখবে। নবী করিম সা. জানিয়েছেন, জান্নাতের সিঁড়ির ধাপ হবে কোরআনের আয়াত সংখ্যার সমপরিমাণ। কিয়ামতের দিন কোরআনের পাঠককে বলা হবে, দুনিয়াতে যেভাবে বিশুদ্ধ উচ্চারণ ও তারতিলের সঙ্গে মন দিয়ে কোরআন পাঠ করা হতো, ঠিক সেভাবেই পাঠ করে ওপরের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হবে। যে ব্যক্তি জীবনে পূর্ণ কোরআন আয়ত্ত ও পাঠ করেছে, সে জান্নাতের সর্বোচ্চ চূড়ায় অধিষ্ঠিত হবে। আর যে ব্যক্তি কোরআনের যতটুকু অংশ পাঠ করেছে, সে ততটুকু ধাপ বেয়ে উঠবে; তার পাঠ যেখানে সমাপ্ত হবে, তার প্রাপ্তির মর্যাদাও সেখানেই শেষ হবে এবং সেটিই হবে তার চিরস্থায়ী সুখের ঠিকানা।

দুনিয়ায় কোরআন চর্চা ও শিক্ষাদানের মাহাত্ম্য তুলে ধরে আল্লাহর রাসুল সা. ঘোষণা করেছেন, মানুষের মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদাবান ও উত্তম তিনিই, যিনি নিজে কোরআন শিক্ষা করেন এবং অন্যকে তা শেখান। কোরআনের একটি অক্ষর পাঠ করলে দশটি নেকির সমপরিমাণ পুণ্য লেখা হয়। একইসঙ্গে রাসুলুল্লাহ সা. সুসংবাদ দিয়েছেন, যে ব্যক্তি নিষ্ঠার সাথে কোরআন পড়ে, মুখস্থ রাখে এবং এর অনুশাসনগুলো জীবনে মেনে চলে, সে জান্নাতে মহান সম্মানিত ফেরেশতাদের সঙ্গী হবে। আর যার পাঠ করতে কষ্ট হয়, জড়তা থাকা সত্ত্বেও অব্যাহত প্রচেষ্টা চালিয়ে নিজেকে কালামের সঙ্গে যুক্ত রাখে, সে সাধারণের চেয়ে দ্বিগুণ সওয়াব লাভ করবে। পরিশেষে মহানবী সা. উম্মতকে তাগিদ দিয়ে নির্দেশ করেছেন কোরআন তেলাওয়াত করতে, কারণ মহাবিচারের কঠিন দিনে এই কোরআন এবং পবিত্র সিয়াম বান্দার মুক্তির পক্ষে আল্লাহর দরবারে বিশেষ সুপারিশকারীর দায়িত্ব পালন করবে।