মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

বিশুদ্ধ নিয়ত ছাড়া আমল কবুল না হওয়ার কারণ

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬, ১১:৪৯ এএম

বিশুদ্ধ নিয়ত ছাড়া আমল কবুল না হওয়ার কারণ

ছবি: Ai

ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী মানুষের প্রতিটি নেক আমল বা সৎকাজ কবুল হওয়ার প্রধান পূর্বশর্ত হলো নিয়তের বিশুদ্ধতা। অন্তরের খাঁটি সংকল্প ও একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্য ছাড়া কোনো ভালো কাজই গ্রহণযোগ্যতা পায় না। কেবল লোকদেখানো মানসিকতার কারণে অনেক বড় পুণ্যময় কাজও সম্পূর্ণ বিনষ্ট হতে পারে, আবার কেবল আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে করা সামান্য আমলও পরম গ্রহণযোগ্যতা পেতে পারে। তাই যেকোনো নেক আমল কেবল মহান প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নিবেদিত হওয়া অপরিহার্য, পার্থিব কোনো প্রশংসা বা কারও সন্তুষ্টির জন্য নয়।

মানুষের অন্তরের প্রতিটি গোপন ভাবনা সম্পর্কে মহান আল্লাহ পুরোপুরি অবগত। পবিত্র কোরআনের সুরা আল-ইমরানের ২৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, অন্তরে যা আছে তা গোপন রাখা হোক কিংবা প্রকাশ করা হোক, আল্লাহ তার সবকিছুই জানেন। আকাশমণ্ডলী ও জমিনে যা কিছু রয়েছে তাও তাঁর জানা এবং তিনি সবকিছুর ওপর সর্বশক্তিমান। মানুষের বাহ্যিক রূপ কিংবা ধনসম্পদের চেয়ে অন্তরের মনোভাবই প্রধান মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়। বিখ্যাত সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে বলা হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ করেছেন যে নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষের বাহ্যিক রূপ কিংবা বিত্তবৈভবের দিকে তাকান না, বরং তিনি লক্ষ্য করেন বান্দার অন্তর ও আমলের প্রতি।

হাদিসশাস্ত্রে কাজের মূল ভিত্তি হিসেবে নিয়তকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) মিম্বরে দাঁড়িয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী উদ্ধৃত করে জানিয়েছিলেন, প্রতিটি কাজের প্রাপ্য বা ফলাফল নিয়তের ওপর নির্ভর করে এবং মানুষ তার নিয়তের অনুপাতেই প্রতিফল পায়। ফলে যার হিজরত পার্থিব কোনো স্বার্থ অর্জন কিংবা কোনো নারীকে বিয়ের উদ্দেশ্যে হবে, তার হিজরত সেই লক্ষ্যেই গণ্য হবে। লক্ষ্যের বিশুদ্ধতার বিষয়টি জিহাদের প্রেক্ষাপটেও স্পষ্টভাবে উল্লেখিত রয়েছে।

হজরত আবু মুসা (রা.) থেকে বর্ণিত এক বর্ণনায় জানা যায়, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে জানতে চান যে কেউ যুদ্ধলব্ধ সম্পদের আশায়, কেউ খ্যাতি অর্জনের জন্য আবার কেউ বীরত্ব প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে লড়াইয়ে শামিল হলে তাদের মধ্যে কে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর পথে যুদ্ধ করল। উত্তরে রাসুলুল্লাহ (সা.) জানান, কেবল যে ব্যক্তি আল্লাহর বাণী সমুন্নত রাখার উদ্দেশ্যে লড়াই করে, সে-ই আল্লাহর পথে যুদ্ধকারী হিসেবে গণ্য।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত অপর একটি নির্দেশনায় জিহাদের বিশুদ্ধ মানসিকতা সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে। সেখানে রাসুলুল্লাহ (সা.) জানান, ধৈর্য ও পুণ্য লাভের আশায় যুদ্ধ করলে কিয়ামতের দিন আল্লাহ সেই দুটি গুণেই বান্দাকে উত্থিত করবেন। বিপরীতে প্রদর্শনীর ইচ্ছা ও সম্পদ লাভের উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করলে কিয়ামতের দিন লোকদেখানো রিয়াকারী ও সম্পদলোভী রূপেই উপস্থিত করা হবে। অর্থাৎ একজন মানুষ যে মানসিকতা নিয়ে যুদ্ধ করবে বা মৃত্যুবরণ করবে, তাকে সেই অবস্থায়ই পুনরুত্থিত করা হবে।

বিশুদ্ধ নিয়তের অভাবে কিয়ামতের ময়দানে সমাজমান্য ব্যক্তিরাও কঠিন শাস্তির মুখে পড়তে পারেন। হজরত সুলায়মান ইবনু ইয়াসার (রহ.) থেকে বর্ণিত বিবরণ থেকে জানা যায়, সিরিয়াবাসী নাতিল (রহ.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর উদ্ধৃতি শোনার অনুরোধ জানালে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) পরকালের প্রথম বিচারের এক নির্মম সত্য তুলে ধরেন। কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম এমন একজন ব্যক্তির বিচার হবে যিনি দৃশ্যত শহীদ হয়েছিলেন। তাকে হাজির করে আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হলে সে তা স্বীকার করবে।

এরপর তাকে প্রশ্ন করা হবে যে এসব নেয়ামতের বিনিময়ে সে কী আমল করেছে। জবাবে সে দাবি করবে যে সে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করে জীবন দিয়েছে। তখন আল্লাহ তাকে মিথ্যাবাদী আখ্যায়িত করে বলবেন যে লোকে তাকে বীর বলবে—এই উদ্দেশ্যেই সে মূলত যুদ্ধ করেছিল এবং দুনিয়ায় তা বলাও হয়ে গেছে। এরপর ঐশ্বরিক নির্দেশে তাকে উপুড় করে হেঁচড়ে নিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। অনুরূপভাবে লোকদেখানো উদ্দেশ্যে জ্ঞান চর্চাকারী আলেম এবং প্রশংসার আশায় সম্পদ ব্যয়কারী দানশীল ব্যক্তিরও একই পরিণতি ঘটবে বলে নথিবদ্ধ রয়েছে।