রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

নাসার প্রযুক্তিতে মাঠে ফিরছেন নেইমার: চোট কাটাতে বিশেষ রিহ্যাব

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

জুন ১৩, ২০২৬, ০২:২৮ পিএম

নাসার প্রযুক্তিতে মাঠে ফিরছেন নেইমার: চোট কাটাতে বিশেষ রিহ্যাব

ব্রাজিলিয়ান ফুটবল তারকা নেইমারকে মাঠে ফেরাতে এবার স্পোর্টস সায়েন্সের সবচেয়ে আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে মরক্কোর বিপক্ষে তিনি খেলতে পারবেন কিনা তা নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের সংশয়। বর্তমানে তিনি ডান পায়ের কাফ মাসেলের দ্বিতীয় গ্রেডের ইনজুরিতে ভুগছেন। এই গুরুতর চোট থেকে দ্রুত রিকভারি নিশ্চিত করতে সাধারণ চিকিৎসার পাশাপাশি দুটি অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তি বেছে নিয়েছে মেডিকেল টিম। 

এর মধ্যে একটি বিশেষ প্রযুক্তি মূলত মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা আবিষ্কার করেছিল।চোটের পুনর্বাসনে এই আধুনিক চিকিৎসা চলছে।নাসার উদ্ভাবিত এই বিশেষ যন্ত্রটির নাম অ্যান্টি গ্রাভিটি ট্রেডমিল। এটি মূলত মহাকাশচারীদের জন্য তৈরি করা হয়েছিল যাতে শূন্য মাধ্যাকর্ষণে বা মহাকাশে চলাফেরার সময় তাদের শারীরিক ভারসাম্য বজায় থাকে। 

এলিট পর্যায়ের খেলাধুলায় এখন খেলোয়াড়দের পুনর্বাসনে এই প্রযুক্তি নিয়মিত ব্যবহৃত হচ্ছে। এই বিশেষ ট্রেডমিলের মাধ্যমে নেইমারের ডান পায়ের ওপর থেকে শরীরের অতিরিক্ত স্ট্রেস বা চাপ সম্পূর্ণ কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে তার চোট পাওয়া পেশির ওপর কোনো বাড়তি ওজন পড়ে না এবং পুনর্বাসন প্রক্রিয়া দ্রুত হয়।এই যন্ত্রটিতে দৌড়ানোর জন্য খেলোয়াড়কে একটি বিশেষ নকশার শর্টস পরতে হয়। সেই শর্টসটি সরাসরি ট্রেডমিলের সঙ্গে যুক্ত থাকে এবং খেলোয়াড়ের কোমরের নিচের অংশটি একটি সম্পূর্ণ বায়ুরোধী চেম্বারের মধ্যে আবদ্ধ করা হয়। 

এরপর সেই চেম্বারের ভেতরে নির্দিষ্ট মাত্রায় বাতাস প্রবেশ করানো হয় যা নিচ থেকে উপরের দিকে একটি ঊর্ধ্বমুখী চাপ সৃষ্টি করে। এই চাপের কারণে অ্যাথলেট নিজের শরীরের মূল ওজনের চেয়ে অনেক কম ওজন অনুভব করেন। নেইমারের ওজন যদি ৭০ কিলোগ্রাম হয় তবে এই যন্ত্রের ভেতরে তিনি মাত্র ৩৫ থেকে ৪৫ কিলোগ্রাম ওজন অনুভব করবেন।

এর ফলে কাফ মাসেল বা পায়ের মেটাটারসাল হাড়ের ওপর বাড়তি কোনো চাপ সৃষ্টি ছাড়াই কার্ডিও এক্সারসাইজ করা সম্ভব হয়। স্বাভাবিকভাবে ৭০ কেজি ওজনের একজন মানুষ সাধারণ ট্রেডমিলে দৌড়ানোর সময় পায়ের নিচের অংশে যে তীব্র চাপ পড়ে নেইমারের ক্ষেত্রে তা এখন ঘটছে না। সুইমিং পুলে বা পানির ভেতরে দৌড়ালে শরীরের ওপর এক ধরনের বিপরীত পানির চাপ তৈরি হয় যা অনেক সময় চোটের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। কিন্তু এই অ্যান্টি গ্রাভিটি চেম্বারে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে দৌড়ানো যায় এবং হাঁটুর ওপর থেকে চাপ কমে যায়।

নেইমারকে সুস্থ করতে ব্যবহৃত দ্বিতীয় প্রযুক্তিটি হলো সম্পূর্ণ পিওর অক্সিজেন চেম্বার। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে হাইপারবেরিক অক্সিজেন থেরাপি চেম্বার বলা হয় যা মানব শরীরের ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যুগুলোতে অক্সিজেনের সরবরাহ কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। এই চেম্বারের ভেতরে অক্সিজেনের চাপ স্বাভাবিক বাতাসের চাপের চেয়ে প্রায় আড়াই গুণ বেশি থাকে। অতিরিক্ত মাত্রার এই বিশুদ্ধ অক্সিজেন রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে দ্রুত চোট পাওয়া স্থানে পৌঁছায় এবং ক্ষতিগ্রস্ত পেশি দ্রুত পুনর্গঠনে সহায়তা করে। পেশাদার অ্যাথলেটরা চোট কাটাতে এবং ম্যাচের পর ক্লান্তি দূর করতে গত প্রায় ১০ বছর ধরে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন।

এই বিশেষ অক্সিজেন চেম্বারটি মূলত দুটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাজ করে যা কম্প্রেশন এবং ডিকম্প্রেশন নামে পরিচিত। চেম্বারের ভেতরে রোগীকে প্রবেশ করিয়ে যখন অক্সিজেনের প্রবাহ বাড়ানো হয় তখন ভেতরের চাপ বৃদ্ধি পায় এবং রক্তে অক্সিজেনের দ্রবণীয়তা বাড়ে। এই উচ্চমাত্রার অক্সিজেন শরীরের শ্বেত রক্তকণিকাকে উদ্দীপ্ত করে যা যেকোনো ধরনের অভ্যন্তরীণ ইনফেকশন বা প্রদাহ দ্রুত সারিয়ে তুলতে পারে। প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টার একটি সেশন শেষে বাইরে থাকা বিশেষজ্ঞ ধীরে ধীরে চেম্বারের ভেতরের চাপ কমাতে শুরু করেন।

চাপ কমানোর এই শেষ প্রক্রিয়াটিকে ডিকম্প্রেশন বলা হয় যার মাধ্যমে শরীর আবার স্বাভাবিক বায়ুমণ্ডলীয় অবস্থায় ফিরে আসে। গত বিশ্বকাপেও চোটের মুখোমুখি হওয়ার পর নেইমারকে মাঠের বাইরে দীর্ঘ সময় কাটাতে হয়েছিল এবং তখনও দ্রুত সুস্থতার জন্য এমন আধুনিক প্রযুক্তিগত সহায়তা নেওয়া হয়েছিল। বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে স্পোর্টস মেডিসিন এবং স্পোর্টস বায়োমেকানিক্সের ব্যবহার এখন অনেক দূর এগিয়ে গেছে। উন্নত দেশগুলোতে খেলোয়াড়দের সুরক্ষায় এবং চোট পরবর্তী পুনর্বাসনের জন্য ডেডিকেটেড সেন্টার অব এক্সিলেন্স গড়ে তোলা হয়।

ক্রিকেট বা ফুটবলসহ যেকোনো খেলায় আন্তর্জাতিক সাফল্য ধরে রাখতে স্পোর্টস ফিজিওলজি এবং স্পোর্টস অ্যানালিটিক্সের ভূমিকা এখন অনস্বীকার্য। বাংলাদেশ এখনো স্পোর্টস সায়েন্সের এই আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও উন্নত চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানির ক্ষেত্রে বেশ পিছিয়ে রয়েছে। দেশের ক্রীড়াবিদদের চোটের সঠিক রিহ্যাব নিশ্চিত করতে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধান এবং আধুনিক স্পোর্টস মেডিসিন সেন্টার গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। আধুনিক ক্রীড়া প্রশাসনের কাজের পরিধি এখন বিশ্বজুড়ে এই উচ্চপ্রযুক্তির সেবাকে তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়ার দিকেই এগোচ্ছে।