রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,
বাণিজ্যিক পাখি পালন

বিদেশি পাখির বাণিজ্যিক খামারে সাভারের জাকিরের সাফল্য

কৃষি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬, ১১:৩৫ এএম

বিদেশি পাখির বাণিজ্যিক খামারে সাভারের জাকিরের সাফল্য

ঢাকার সাভারের বিশ মাইলের কুটুরিয়া এলাকায় গড়ে উঠেছে বিভিন্ন প্রজাতির বিদেশি পাখির বাণিজ্যিক খামার। শখের বশে একজোড়া বাজরিগার দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও দীর্ঘ এক যুগের সাধনায় এটি এখন পূর্ণাঙ্গ ব্যবসায় রূপ নিয়েছে।

চাকরির টানাপোড়েন ছেড়ে এখন পাখি পালনেই স্বাবলম্বী উদ্যোক্তা জাকির হোসেন। বারো থেকে তেরো বছর আগে একটি ছোটখাটো চাকরির পাশাপাশি শখের বসে পাখি ও ফেন্সি কবুতর লালন-পালন শুরু করেন জাকির। পাঁচ বছর আগে করোনাকালীন ঘরবন্দি সময়ে যখন যান চলাচল বন্ধ ছিল, তখন অনলাইনের মাধ্যমে সারা দেশে শৌখিন কবুতর সরবরাহ করে সাফল্য পান তিনি। পরবর্তীতে বাজারে কবুতরের চাহিদা কমে যাওয়ায় তিনি পুরোপুরি বিদেশি পাখি পালনে মনোযোগ দেন। চাকরির চেয়ে পাখি প্রজননেই বেশি আয় নিশ্চিত হওয়ায় তিনি চাকরি ছেড়ে দেন। বর্তমানে তার খামারে প্রায় পনেরো লাখ টাকার পাখি সম্পদ রয়েছে। সাভারের মূল খামারে সরাসরি রয়েছে সাত থেকে আট লাখ টাকার বিভিন্ন জাতের পাখি। কোনো কোনো মাসে স্বাভাবিকভাবে সত্তর হাজার থেকে দেড় লাখ টাকার পাখি বিক্রি হলেও বিশেষ সময়ে মাসে পনেরো থেকে বিশ লাখ টাকার পাখিও বিক্রি হয়।

নতুনদের ক্ষেত্রে অন্তত পাঁচ থেকে দশ জোড়া পাখি দিয়ে যাত্রা শুরুর পরামর্শ উদ্যোক্তার। খামারের সবচেয়ে মূল্যবান জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে ইন্ডিয়ান রিংনেক টিয়া। এই প্রজাতির চার-পাঁচ মাস বয়সী হলুদ রঙের বাচ্চার দাম প্রতিটি পনেরো থেকে ষোল হাজার টাকা। এদের প্রাপ্তবয়স্ক পাখির দাম আরও বেশি। এই পাখিগুলোকে আড়াই থেকে তিন মাস বয়স পর্যন্ত নিজস্ব হাতে বা হ্যান্ড ফিডিং পদ্ধতিতে খাওয়াতে হয়। দেশীয় সবুজ টিয়া শিকার বা খাঁচায় পোষা আইনত নিষিদ্ধ হলেও রিংনেকের মতো বিদেশি খাঁচার পাখি পালন পুরোপুরি বৈধ। রিংনেক ছাড়াও এই খামারে রয়েছে সান চিক কনুর, ডাবল রেড ফ্যাক্টর সান কনুর, পাইনঅ্যাপেল কনুর, সিনামন কনুর, ক্রিমসন রেড বেলিড কনুর, লাভবার্ড, কোকাটেল এবং ফরপাস।

সান কনুরের বুকের অংশ যত বেশি লাল হয়, তার সৌন্দর্য ও দর তত বৃদ্ধি পায়। দুই থেকে তিন বছর আগে যে সান কনুর জোড়াপ্রতি পঁয়ষট্টি থেকে পঁচাত্তর হাজার টাকায় বিক্রি হতো, দেশে সফল প্রজনন হওয়ায় বর্তমান বাজারে তা পঁচিশ থেকে পয়ত্রিশ হাজার টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। পাইনঅ্যাপেল কনুরের এক একটি বাচ্চার দর আড়াই হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা। খাঁচায় জন্ম নেওয়া সবুজ রঙের রানিং ফরপাস পাখির জোড়া বিক্রি হচ্ছে ছয় থেকে আট হাজার টাকায়।

প্রজনন উপযোগী করতে এদের খাদ্যাভ্যাস ও খাঁচার পরিবেশ অত্যন্ত সংবেদনশীল। পাখিদের দেশীয় ধুলাবালিযুক্ত চিনা না খাইয়ে চার ধরনের মিলেট, ক্যানারি সিড, সূর্যমুখী বীজ, কুসুম ফুলের বীজ, পোলাও ধান ও চীনাবাদামসহ দশ থেকে বারোটি উপাদানের মিশ্রণ দেওয়া হয়। আপেল ও পেয়ারার মতো তাজা ফল দেওয়ার আগে কেমিক্যালমুক্ত করতে বিশ থেকে ত্রিশ মিনিট পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়। খাঁচায় প্লাস্টিকের পাইপ ব্যবহার করলে পাখি পিছলে পড়ে প্রজনন বাধাগ্রস্ত হতে পারে, এজন্য বসার জন্য মোটা প্রাকৃতিক গাছের ডাল, বিশেষ করে নিম গাছের ডাল ব্যবহারের পরামর্শ দেন তিনি।

পাখির বয়স ও লিঙ্গ নির্ধারণে আধুনিক প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করতে হয়। কনুর পাখির ক্ষেত্রে সঠিক লিঙ্গ শনাক্তে পালকের নমুনা সংগ্রহ করে জিপার ব্যাগের মাধ্যমে গবেষণাগারে ডিএনএ পরীক্ষা করানো হয়। প্রাপ্তবয়স্ক পাখি বছরে সাধারণত দুই থেকে তিনবার বংশবৃদ্ধি করতে পারে।

পাখির বাজার পরিস্থিতি নিয়ে জাকির জানান, খাবারের উচ্চমূল্যের কারণে বাজার খারাপ হয় না। বরং প্রতিবেশী দেশ থেকে অবৈধভাবে আনা অসুস্থ পাখির কারণেই রোগ ছড়িয়ে সাধারণ খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং অযাচিত দরপতন ঘটে। তাই স্থানীয়ভাবে প্রজনন করানো সুস্থ পাখি সংগ্রহ করে দেশেই স্বাবলম্বী খামার গড়ে তোলা সম্ভব।