রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ঝুঁকি

এআই নিরাপত্তায় জাতিসংঘের নতুন কাঠামোর প্রস্তাব সিঙ্গাপুরের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬, ১১:৫৭ এএম

এআই নিরাপত্তায় জাতিসংঘের নতুন কাঠামোর প্রস্তাব সিঙ্গাপুরের

ছবি: সংগৃহীত

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের বহুমুখী ঝুঁকি মোকাবিলায় জাতিসংঘের অধীনে একটি সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক কাঠামো গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছে সিঙ্গাপুর। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে এই প্রস্তাব তুলে ধরেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান বালাকৃষ্ণান। তিনি উল্লেখ করেন যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাব্য বিপদ কোনো একক দেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে আটকে নেই। এই প্রযুক্তির নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত প্রয়োগ নিশ্চিত করতে বিশ্বজুড়ে অভিন্ন নিয়মের প্রচলন করা এখন অপরিহার্য। প্রযুক্তির অগ্রগতি বন্ধ না করে বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলাই এর মূল লক্ষ্য।

২৬ সেপ্টেম্বর সাধারণ বিতর্কের বক্তব্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালাকৃষ্ণান জাতিসংঘের কাঠামোগত আন্তর্জাতিক চুক্তি বা ইউএন ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন এআই সেফগার্ডসের ধারণা বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করেন। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় জাতিসংঘের যে ধরনের রূপরেখা চুক্তি রয়েছে, ঠিক তেমনি এই নতুন উদ্যোগও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের মৌলিক আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারণ ও পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তি মজবুত করতে পারে বলে তিনি দাবি করেন। বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা এখন চরম আকার ধারণ করেছে।

সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানান যে এআই প্রযুক্তির রূপান্তর আজ এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছে যে এই প্রযুক্তিকে বাদ দেওয়া কিংবা এর বিকাশ থামিয়ে দেওয়ার দাবি কোনোভাবেই বাস্তবসম্মত নয়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা এবং এ খাতে তাদের বিপুল বিনিয়োগের কারণে এই যাত্রাকে আটকে রাখা অসম্ভব। প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বৈশ্বিক নিরাপত্তা রক্ষাকবচও সমান গতিতে শক্তিশালী করা অত্যন্ত জরুরি। এআইয়ের সম্ভাব্য ভয়াবহ ঝুঁকির বিষয়ে বিশ্বনেতাদের সতর্ক করেছেন সিঙ্গাপুরের এই শীর্ষ কূটনীতিক।

তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার ওপর মানুষের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সাথে উগ্র বা বিপজ্জনক ব্যক্তি ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে এআই প্রযুক্তি চলে গেলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগের মাধ্যমে জৈব অস্ত্রসহ গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরির ঝুঁকিপূর্ণ সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে। এই প্রযুক্তি ব্যাপক রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তিনি জোর দেন যে উন্নত এআই মডেলগুলো উন্মুক্ত করার আগে সেগুলোর কঠোর আন্তর্জাতিক পরীক্ষা ও নিরাপত্তা মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে এবং কোনো স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ করলে মানুষের তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপের পূর্ণ সুযোগ থাকতে হবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সার্বিক তদারকি ও নিয়ন্ত্রণে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেছে সিঙ্গাপুর। ভিভিয়ান বালাকৃষ্ণান উদাহরণ দিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা যেভাবে পারমাণবিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে কিংবা আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন যেভাবে বৈশ্বিক মান নির্ধারণে কাজ করে, ঠিক তেমনি এআই ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একটি স্বতন্ত্র বৈশ্বিক তদারকি প্রতিষ্ঠান গঠন করা লাগতে পারে। এর আগে চলতি সপ্তাহে সিঙ্গাপুরসহ ২০টির বেশি দেশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ফ্রন্টিয়ার এআই মডেলের আন্তর্জাতিক তদারকির পক্ষে একটি যৌথ ঘোষণাপত্রে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন জানিয়েছে।

তবে বিশ্বের দুই শীর্ষ প্রযুক্তি পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এখনও ওই যৌথ ঘোষণায় স্বাক্ষর করেনি। অথচ বিশ্বমঞ্চে এই দুই পরাশক্তির বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতাই মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বর্তমান গতি নির্ধারণ করছে। তবে প্রতিযোগিতার ভেতরে থেকেও উভয় দেশ এআই নিরাপত্তা প্রশ্নে পারস্পরিক আনুষ্ঠানিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। সিঙ্গাপুরের উত্থাপিত এই কাঠামোর মূল দর্শন হলো প্রযুক্তির সম্ভাবনাকে আটকে না রেখে আন্তর্জাতিক বিধিমালার মাধ্যমে মানবজাতির জন্য তার ঝুঁকিগুলোকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা।