সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৬, ০৪:০৭ পিএম
খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার খাজাডাঙ্গা গ্রামে শখের বশে শুরু করা মিশ্র মাছ চাষকে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক প্রকল্পে রূপান্তর করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন উদ্যোক্তা নূর মোহাম্মদ।
ছোট ভাই এস এম নুরুজ্জামান বিপ্লবের কেনা তিন একরের একটি বিশাল পুকুরে ২০১৯ সালে এই মৎস্য খামারের সূচনা হয়।
শৈশব থেকেই বড়শি দিয়ে মাছ ধরার তীব্র শখ ছিল নূর মোহাম্মদের। বিভিন্ন স্থানে টিকিটের বিনিময়ে সৌখিন মাছ শিকারে যেতেন তিনি। ছোট ভাই তিন একরের জলাশয়টি কেনার পর সেই শখ থেকেই তিনি সেখানে পরিকল্পিত মাছ চাষের উদ্যোগ নেন। প্রথমে পোনা মজুদের আগে স্থানীয় উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে পানির গুণাগুণ ও মাটি পরীক্ষা করে চুন প্রয়োগের মাধ্যমে জলাশয় শোধন করা হয়। শুরুর দিকে পুকুরে তেলাপিয়ার পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চল থেকে আট থেকে দশ টাকা দরে তিন হাজার পিস ভেটকি মাছের পোনা এনে ছাড়া হয়েছিল।
এক বছরের মধ্যে প্রতিটি ভেটকি দুই থেকে আড়াই কেজি ওজনে পৌঁছায় এবং তা বাজারে প্রতি কেজি ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকায় বিক্রি হয়। প্রথম বছরেই ব্যাপক সফলতা অর্জন করায় উপজেলা প্রশাসন থেকে তিনি শ্রেষ্ঠ মৎস্যচাষির স্বীকৃতি লাভ করেন। প্রাথমিক সাফল্যের পর মৎস্য অধিদপ্তরের সার্বিক পরামর্শে কার্প জাতীয় দেশীয় ও বিদেশি মাছের সমন্বিত চাষ শুরু করেন নূর মোহাম্মদ। বর্তমানে তাঁর পুকুরে রুই, কাতলা, মৃগেল, ব্ল্যাক কার্প, সিলভার কার্প ও দেশি জাতের পাঙ্গাশের বিশাল মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে তিন থেকে চার বছর বয়সের কাতলা মাছের ওজন হয়েছে ১০ থেকে ১২ কেজি, এমনকি কোনো কোনোটির ওজন ১৬ থেকে ২০ কেজি পর্যন্ত পৌঁছেছে। এই আকারের একটি কাতলার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা। খামারের বিশ কেজি ওজনের একেকটি ব্ল্যাক কার্পের মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা। মাঝারি আকারের মৃগেল মাছের ওজন তিন থেকে চার কেজি এবং সিলভার কার্পের ওজন ১০ থেকে ১১ কেজি পর্যন্ত হয়েছে।
মাছের যথাযথ শারীরিক বৃদ্ধি ও সুস্থতা নিশ্চিত করতে পুকুরের তিনটি স্তরের প্রাকৃতিক পরিবেশ কাজে লাগানো হচ্ছে। প্রতিদিনের খাবারে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করেন খামারি। একদিন পর পর তিনি তিনটি বস্তায় ৯০ কেজি গমের ভুসি রশিতে বেঁধে পুকুরের নির্দিষ্ট স্থানে ঝুলিয়ে দেন। এর পাশাপাশি মৎস্য অধিদপ্তরের পুষ্টি তালিকা অনুযায়ী খৈল, গমের ভুসি ও সরিষার খৈলসহ পাঁচ থেকে সাতটি উপাদানের মিশ্রণে তৈরি পুষ্টিকর খাবার প্রয়োগ করা হয়। মাছের শরীরে পরজীবী উকুন দেখা দিলে বিশেষ ওষুধ স্প্রে করে রোগবালাই দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা হয়।পুকুরের পানির পরিবেশ বিশুদ্ধ রাখতে বাইরে থেকে কাউকে সাবান মেখে গোসল করতে দেওয়া হয় না। নিয়মিত পানির স্তর নিয়ন্ত্রণের জন্য সার্বক্ষণিক মোটর ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। বাণিজ্যিক বাজারজাতকরণের পাশাপাশি সৌখিন মৎস্য শিকারিদের কাছে টিকিট বিক্রির মাধ্যমেও উল্লেখযোগ্য আয় করছেন নূর মোহাম্মদ।
প্রথম দিকে খামারকে পরিচিত করতে প্রতি সিটের জন্য ১০ হাজার টাকা করে টিকিট নির্ধারণ করা হয়। অনেক খামারে যেখানে ২৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা টিকিট বিক্রি হয়, সেখানে নূর মোহাম্মদের পুকুর থেকে বিশালাকার মাছ পাওয়ার পর সৌখিন শিকারিরা সামাজিক মাধ্যমে অভিজ্ঞতা তুলে ধরলে দূরদূরান্ত থেকে মাছ শিকারিরা আসতে শুরু করেন। খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জয়দেব পাল জানান, উপকূলীয় খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে মূলত গলদা ও বাগদা চিংড়ি চাষের জন্য পরিচিত ছিল। কিন্তু পানির লবণাক্ততা কমে এলে ঘের ও পুকুরগুলো অলস পড়ে থাকে।
এই বাস্তবতায় মৎস্য অধিদপ্তর খুলনা অঞ্চলে কার্প জাতীয় মাছের ফ্যাটেনিং বা বড় আকারের পোনা দ্রুত বর্ধন করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। সেই কর্মসূচির আওতায় নূর মোহাম্মদকে বাছাই করে বিশেষ প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হয়। পুকুরে শুরুতেই প্রায় ৭৫০ গ্রাম ওজনের রুই, কাতলা, মৃগেল ও সিলভার কার্পের মজুদ করা হয়েছিল। নির্ধারিত মাত্রায় ভাসমান খাবার ও স্থানীয়ভাবে তৈরি পুষ্টিকর খাদ্য ব্যবহারের ফলে মাত্র দেড় বছরের মধ্যে প্রতিটি মাছ চার থেকে পাঁচ কেজি এবং পরবর্তীতে সাত থেকে আট কেজি ছাড়িয়ে যায়। কর্মকর্তা জানান, প্রচলিত পদ্ধতির চেয়ে কার্প ফ্যাটেনিং পদ্ধতিতে মাছ চাষ করে চাষিরা অন্তত তিন গুণ বেশি অর্থ আয় করতে পারছেন।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, পদ্মা সেতু চালুর ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মৎস্য অর্থনীতিতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। রূপসা থেকে আহরিত তাজা ও বিশালাকার কার্প মাছ মাত্র তিন ঘণ্টার মধ্যে ঢাকার কারওয়ান বাজারে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। স্থানীয় বাজারে যেখানে বড় আকারের মাছ কেজিপ্রতি প্রায় ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়, ঢাকায় তা ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি করা সম্ভব। ফলে কার্প ফ্যাটেনিং এ অঞ্চলে ব্যাপক বিপ্লব সৃষ্টি করছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন