রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

স্ত্রীর হার চুরি করে পেঁপে বাগান শুরু করেছিলাম

কৃষি ডেস্ক

আগস্ট ১২, ২০২৬, ০৮:৪৫ পিএম

স্ত্রীর হার চুরি করে পেঁপে বাগান শুরু করেছিলাম

ছবি: দিনাজপুর টিভি

বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার বাইলাখালী গ্রামে পুকুর পাড়ে বাণিজ্যিক পেঁপে চাষ করে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছেন কৃষক সুমন। প্রতিটি ইঞ্চি জমি কাজে লাগিয়ে আধুনিক ও সুপরিকল্পিত পদ্ধতিতে পেঁপে বাগান গড়ে তুলেছেন তিনি। তার এই কৃষিজ উদ্যোগ দেখতে এখন দেশের নানা প্রান্ত থেকে দর্শনার্থী ও নতুন উদ্যোক্তারা ভিড় করছেন বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে।ছয় বছর আগে চরম আর্থিক সংকটের মুখে স্ত্রীর গলার হার চুরি করে এই কৃষিকাজ শুরু করেছিলেন তিনি।

সুমন জানান যে প্রবাস জীবনে উপার্জিত সব অর্থ হারিয়ে তিনি যখন দিশেহারা ও নিঃস্ব, তখন বাধ্য হয়ে স্ত্রীর গলার হার চুরি করে কৃষিতে বিনিয়োগ করেন। একজন স্বামীর জন্য স্ত্রীর হার চুরি করা কতটা কষ্টের, তা কেবল ভুক্তভোগীই বুঝবেন বলে তিনি মন্তব্য করেন। তার স্ত্রী মারাত্মক কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার আগে তাকে সান্ত্বনা ও পূর্ণ সমর্থন দিয়ে গিয়েছিলেন। স্ত্রীর সেই নেক দোয়া ও অনুপ্রেরণাই তাকে আজকের এই সাফল্যের চূড়ায় নিয়ে এসেছে বলে তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করেন।

বাগান শুরুর প্রথম বছরেই রাতের আঁধারে দুর্বৃত্তরা তার বাগানের অসংখ্য ফলসহ সব গাছ কেটে ফেলেছিল। তবে সেই চরম ক্ষতির মুখেও তিনি এক মুহূর্তের জন্য হাল ছাড়েননি বা পিছিয়ে আসার কথা ভাবেননি। অক্লান্ত পরিশ্রমে নতুন করে শুরু করা সেই বাগান এখন তার ঘুরে দাঁড়ানোর মূল ভিত্তি। জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে তিনি পুকুর পাড়ে জালের বেড়া দিয়ে বাড়তি জায়গা তৈরি করেছেন। এই জালের কারণে মাটি ক্ষয় রোধ হওয়ার পাশাপাশি তিনি আরও একটি অতিরিক্ত সারিতে পেঁপের চারা রোপণ করতে সক্ষম হয়েছেন। এই সুপরিকল্পিত পদ্ধতিতেই তিনি সাধারণ কৃষকদের চেয়ে অনেক বেশি ফলন পাচ্ছেন।

বর্তমানে কৃষকদের মাঝে মানসম্মত পেঁপে চারার ব্যাপক চাহিদা থাকায় তিনি একটি বড় পলিহাউস নির্মাণ করেছেন। এখান থেকে একসঙ্গে দুই থেকে আড়াই লাখ চারা উৎপাদন করা সম্ভব হবে। শুরুতে কয়েকজন এজেন্টের মাধ্যমে চারা সরবরাহ করতে গিয়ে বিড়ম্বনার শিকার হওয়ায় এখন তিনি নিজেই সরাসরি কৃষকদের কাছে চারা পৌঁছে দিচ্ছেন।

পেঁপে চাষ থেকে এ বছর বড় অঙ্কের আর্থিক লাভের আশা করছেন সুমন। তিনি মূলত গাছে পাকা পেঁপে বিক্রি করেন, যার কারণে বাজারে এর মূল্য অনেক বেশি পাওয়া যায়। তার হিসাব অনুযায়ী প্রতিটি গাছ থেকে কমপক্ষে দুই হাজার টাকার ফলন পাওয়া সম্ভব। আবহাওয়া অনুকূল থাকলে এবং কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না এলে এ বছর বিশ লাখ টাকার বেশি মুনাফা হবে বলে তিনি প্রত্যাশা করছেন।কৃষকদের জন্য তার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ হলো সঠিক সময়ে পেঁপের চারা রোপণ করা।

সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাস পেঁপে চারা লাগানোর সবচেয়ে উপযুক্ত সময় বলে তিনি মনে করেন। এ সময়ে চারা লাগালে গাছ খাটো থাকে, ফলন ভালো হয় এবং বাজারে উপযুক্ত দাম পাওয়া যায়। বাজারে কোন সময়ে কোন সবজির বা ফলের দাম বেশি থাকে, সেই চাহিদা বুঝে ফসল উৎপাদনের ওপর তিনি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। অসময়ে বা বর্ষায় চারা লাগানোর পুরনো ও ভুল পদ্ধতি থেকে কৃষকদের বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

তার এই বিশাল বাগান পরিদর্শনে এসে স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান যে সুমনের এই উদ্যোগ বরিশাল অঞ্চলের কৃষকদের জন্য একটি অনুকরণীয় মডেল। তার খামারে চাষ করা শাহী জাতের পেঁপে দেশের টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ত সব অঞ্চলের আবহাওয়ার সঙ্গেই মানানসই। কাঁচা ও পাকা পেঁপে বিক্রির পাশাপাশি জ্যাম, জেলি, সস বা চিপস তৈরির মতো প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তোলা গেলে পেঁপে চাষিদের লাভের পরিধি আরও কয়েক গুণ বাড়বে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সুমন নিজের অর্জিত জ্ঞান অন্যান্য কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে ছড়িয়ে দিতে নিরলস কাজ করছেন এবং ইতিমধ্যে তার কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে হাজার হাজার কৃষক সফল খামার গড়ে তুলেছেন। তার এই অভিনব কৃষি পদ্ধতি সম্পর্কে সরাসরি ধারণা নিতে সুদূর নিউজিল্যান্ড থেকেও একটি প্রতিনিধি দল খামারটি পরিদর্শন করেছে।আগামীতেও সাধারণ কৃষকদের সঙ্গে নিয়ে এই আধুনিক কৃষিকাজের সম্প্রসারণ অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা নিয়ে তিনি অগ্রসর হচ্ছেন।