মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,
বৈশ্বিক কৃষি সাফল্য

কৃষি পণ্য উৎপাদনে বাংলাদেশের বৈশ্বিক শীর্ষ অবস্থান

কৃষি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬, ০২:৩৯ পিএম

কৃষি পণ্য উৎপাদনে বাংলাদেশের বৈশ্বিক শীর্ষ অবস্থান

মানবসভ্যতার বিকাশের চাবিকাঠি ছিল যে কৃষি, আবহমানকাল ধরে সেই কৃষিকাজই বাংলাদেশের মানুষের জীবিকার প্রধান অবলম্বন। উত্তরে হিমালয় আর দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের মধ্যবর্তী বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম এই সমতল বদ্বীপটি পৃথিবীর উর্বরতম শস্যক্ষেত্রগুলোর অন্যতম। কর্মসংস্থানে এখনো দেশের সবচেয়ে বড় খাত এটি। মোট শ্রমশক্তির ৪৫ ভাগ সরাসরি কৃষিতে যুক্ত। দেশে সাড়ে তিন কোটিরও বেশি পরিবারের বাস, যার মধ্যে প্রায় পৌনে দুই কোটিই কৃষক পরিবার এবং সক্রিয়ভাবে কৃষিকাজে যুক্ত প্রায় আড়াই কোটি কৃষক।

আগে গ্রামবাংলার চাষিরা জমি কর্ষণ করতেন গরু টানা কাঠের লাঙ্গলে। এখন হালের লাঙ্গলের পাশাপাশি বিস্তৃত জমিতে ব্যবহৃত হচ্ছে পাওয়ার টিলার ও হাইড্রো টিলার। আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহারে কৃষি উৎপাদনে যেমন গতি এসেছে, তেমনি তা জাতীয় অর্থনীতিতেও রাখছে টেকসই অবদান। মোট দেশজ উৎপাদনে কৃষি খাতের অবদান এখন প্রায় ১২ শতাংশ। দেশে মোট আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ প্রায় ৮৮ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর। যেকোনো শস্যবীজ বোনার আগে মূল জমিতে তিন থেকে চারবার চাষ ও মই দিয়ে জমি প্রস্তুত করা হয়, যার ফলে উর্বর পলিমাটি ফসলের জন্য পুরোপুরি উপযোগী হয়ে ওঠে। বাংলাদেশে প্রধানত তিন মৌসুমে ফসলের আবাদ হয়। রবি মৌসুমে চাষ হয় শীত ও বসন্তকালীন ফসলের। খরিপ মৌসুমে বর্ষাকালীন এবং জায়েদ মৌসুমে আবাদ করা হয় গ্রীষ্মকালীন নানা জাতের শস্য। আবাদ শুরু হয় দুটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিতে—মূল জমিতে সরাসরি বীজ বপন করে অথবা আলাদা বীজতলায় চারা তৈরি করে তা মূল জমিতে রোপণের মাধ্যমে। দেশের প্রধান নয়টি ফসলের মধ্যে ধান অন্যতম। মোট আবাদি জমির প্রায় তিন-চতুর্থাংশেই হয় ধানের আবাদ। আউশ চাষ হয় শতকরা প্রায় ৯ ভাগ জমিতে, আমন ৪৯ ভাগ এবং বোরো ধানের আবাদ হয় ৪২ ভাগ জমিতে। বর্তমানে ধানি জমির প্রায় ৮১ ভাগে আধুনিক উফশী জাত, ১০ ভাগে হাইব্রিড জাত এবং বাকি ৯ ভাগে ফলানো হচ্ছে স্থানীয় দেশি জাতের ধান। শিষের ৮০ থেকে ৯০ ভাগ ধানের রং বদলালে কাটার ধুম পড়ে মাঠে মাঠে। সর্বমোট সাড়ে নয় কোটি টন সামগ্রিক কৃষিপণ্যের মধ্যে ধান চাষিরা আউশ, আমন ও বোরো মিলিয়ে বছরে উৎপাদন করছেন প্রায় চার কোটি টন চাল। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম চাল উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ তার প্রায় ৯০ শতাংশ নাগরিকের দানাদার খাদ্যের চাহিদা এই ধান থেকেই পূরণ করছে।

উর্বর পলিমাটি, উষ্ণ-আর্দ্র আবহাওয়া আর কৃষকের পরিশ্রমে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী আঁশ ফসল পাটেও দেশ অগ্রণী। আট লাখ হেক্টরেরও বেশি জমিতে বছরে উৎপাদিত হয় সাড়ে ১৬ লাখ টনের বেশি পাট। দুই থেকে তিন সপ্তাহ পরিষ্কার পানিতে জাগ দিয়ে পচানোর পর ছাল ছাড়িয়ে তৈরি হয় আন্তর্জাতিক মানের আঁশ। উৎপাদিত কাঁচা পাটের প্রায় ৯০ শতাংশ রপ্তানি করে বিশ্ববাজারের মোট চাহিদার এক-চতুর্থাংশ একাই জোগান দিচ্ছে বাংলাদেশ। কন্দজাতীয় খাদ্যফসলে আলুর ভূমিকা এখন অপরিসীম। সাড়ে চার লাখ হেক্টরের বেশি জমিতে দোআঁশ ও বেলে-দোআঁশ মাটিতে রোপণের ৭০ থেকে ৮০ দিনের মধ্যেই আলু ঘরে ওঠে। স্থানীয় ও উফশী জাত মিলিয়ে হেক্টরপ্রতি গড় ফলন প্রায় ২৩ টন। স্বাদ ও মানে অনন্য এই খাদ্যশস্য উৎপাদনে চাষিরা বছরে প্রায় এক কোটি টনের বেশি আলু উৎপাদন করে মাঠ থেকে দেশের বিভিন্ন মোকামে সরবরাহ করেন। এটিও দেশের প্রধান নয়টি ফসলের একটি।

শীতকালীন ফসলের গণ্ডি পেরিয়ে পেঁয়াজ এখন চাষ হচ্ছে শীত, গ্রীষ্ম ও বর্ষা—তিন ঋতুতেই। প্রায় আড়াই লাখ হেক্টর জমিতে হেক্টরপ্রতি গড় ফলন প্রায় ১৪ টন। বছরে প্রায় ৩৫ লাখ টন পেঁয়াজ ফলিয়ে বৈশ্বিক উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন তৃতীয় অবস্থানে। রসুন চাষেও অগ্রগতি চোখে পড়ার মতো। প্রায় ৯০ হাজার হেক্টর জমিতে হেক্টরপ্রতি গড়ে সাড়ে আট মেট্রিক টন রসুন উৎপাদিত হয়। বছরে মোট উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় আট লাখ মেট্রিক টন। জলমগ্ন জমিতে চাষ হওয়া লতিরাজ জাতের কচু দেশের অন্যতম লাভজনক ফসল। একই জমি থেকে প্রথমে লতি, এরপর ফুল এবং শেষ ধাপে কন্দ বা কাণ্ড আহরণ করা হয়। সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশকে বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে রাখতে এই কচু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। রবি ও খরিপ—উভয় মৌসুমে বিস্তৃত মরিচ চাষে হেক্টরপ্রতি গড় ফলন সোয়া টনের মতো। দেশজুড়ে লাখ লাখ হেক্টর জমিতে উৎপাদিত হয় বিপুল পরিমাণ কাঁচা ও শুকনা মরিচ।

স্বল্পমেয়াদি অর্থকরী ফসল হিসেবে জনপ্রিয় শসা ও ক্ষীরা। ৬৫ থেকে ৯০ দিনের জীবনকালের এই ফসল চাষে খরচ কম, মুনাফা বেশি। জাতভেদে বেগুনের ফলন বিঘাপ্রতি ১০০ থেকে ১২০ মণ এবং বছরে মোট উৎপাদন চার লাখ মেট্রিক টনেরও বেশি, যা মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বাজারেও নিয়মিত রপ্তানি হচ্ছে। মাচায় চাষ হওয়া শিম রোপণের ৯৫ থেকে ১৪৫ দিনের মধ্যে সংগ্রহ উপযোগী হয় এবং শতাংশপ্রতি ফলন মেলে ৬০ থেকে ৮০ কেজি। শীতকালে মাঠজুড়ে ফোটে হলুদ সরিষা ফুল। তৈলবীজ চাষের ৭৩ ভাগ জমিতেই হয় সরিষার আবাদ। প্রায় ১২ লাখ হেক্টর জমি থেকে বছরে উৎপাদিত হয় প্রায় ১৭ লাখ টন সরিষা, যাতে তেলের ভাগ থাকে ৪০ থেকে ৪৪ শতাংশ। দেশে তৈলজাত ফসলের তালিকায় এটি রয়েছে চতুর্থ স্থানে। গ্রীষ্মকালীন দ্রুতবর্ধনশীল সবজি কাঁকরোলের ফলন মেলে রোপণের ৬০ থেকে ৭০ দিন পর, বিঘাপ্রতি প্রায় দশ মণ। এছাড়া ২৩ হাজার হেক্টর জমি থেকে বছরে ওঠে প্রায় তিন লাখ টন ফুলকপি ও ব্রকলি, যা উৎপাদনে দেশ বিশ্বে অষ্টম। পাশাপাশি ওলকপি হেক্টরপ্রতি ফলন দেয় প্রায় ৩০ টন। লতানো মিষ্টি কুমড়ার হেক্টরপ্রতি ফলন ২০ থেকে ৪০ টন, চালকুমড়া এবং আমিষসমৃদ্ধ বরবটির উৎপাদনও ব্যাপক। চিচিঙ্গা, করলা, ঢ্যাঁড়শ ও ঝিঙার পাশাপাশি লালশাক, পালং ও ডাটাসহ বছরে মোট সোয়া দুই কোটি টন শাকসবজি ফলিয়ে সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ ধরে রেখেছে বৈশ্বিক তৃতীয় স্থান। উচ্চতায় ছয় থেকে বারো ফুটের মিষ্টি ঘাসজাতীয় ফসল আখের মোট উৎপাদন বছরে প্রায় ৭৫ লাখ টন। এছাড়া ধানের পরই প্রধান দানাদার ফসল হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে ভুট্টা। বিশ্বে যেখানে হেক্টরপ্রতি গড় ফলন পাঁচ টনের মতো, সেখানে বাংলাদেশে তা মিলছে প্রায় সাত টন। বছরে ভুট্টার মোট উৎপাদন এখন প্রায় ৬৪ লাখ টনে পৌঁছেছে। ছায়াযুক্ত বোরজে বছরে তিনবার চাষ হওয়া পান শতাংশপ্রতি ফলন দেয় ৪০ থেকে ৭২ কেজি।

ফল উৎপাদনেও সাম্প্রতিক দশকগুলোতে অভাবনীয় সাফল্য দেখা গেছে। দেশে প্রায় সোয়া একশ জাতের আম চাষ হয় এবং বছরে প্রায় ২৫ লাখ টন আম ফলিয়ে বৈশ্বিক তালিকায় সপ্তম স্থানে বাংলাদেশ। বছরে মোট প্রায় ১৯ লাখ টন কাঁঠাল উৎপাদন করে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করছে। এছাড়া বছরে প্রায় ৩০ লাখ টন কলা উৎপাদিত হয়, যার ৫৩ ভাগ জোগান দেয় নরসিংদী, রাঙামাটি, বান্দরবান, ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়া। মোট সোয়া সাত লাখ হেক্টর জমিতে প্রায় দেড় কোটি টন ফল উৎপাদন করে বৈশ্বিক অঙ্গনে বাংলাদেশ কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।