মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,
কৃষিতে নতুন দিগন্ত

খুলনার পানি কচু যাচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়ায়: ডুমুরিয়ার সাফল্য

কৃষি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬, ০৩:৪৬ পিএম

খুলনার পানি কচু যাচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়ায়: ডুমুরিয়ার সাফল্য

উপজেলার ধোনামাদাডাঙ্গা গ্রামের এই কৃষক প্রায় ১০ থেকে ১১ ফুট লম্বা এবং একেকটি ৩০ থেকে ৩৫ কেজি ওজনের পানি কচু উৎপাদন করে এলাকায় ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছেন। তাকে সবাই এখন চেনেন ‍‍`কচু নিউটন‍‍` নামে। আগে দৌলতপুরের পপুলার জুটমিলে শ্রমিকের কাজ করতেন তিনি। নিজের সামান্য নিচু জমিতে ধান চাষ করতে গিয়ে ছায়ার কারণে ভালো ফলন না পেয়ে ২০০৫ সালের দিকে শ্বশুরবাড়ি থেকে আনা মাত্র ২০০টি চারা দিয়ে তিনি প্রথম এই কচুর আবাদ শুরু করেন। বর্তমানে ৫০ শতক জমিতে বাণিজ্যিকভাবে এই কচুর চাষ সম্প্রসারিত করেছেন তিনি।

লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতা সহ্য করার অসাধারণ ক্ষমতার কারণে খুলনার উপকূলীয় পরিবেশেও এই জাতটি অত্যন্ত দ্রুত বর্ধনশীল হয়ে উঠেছে। চাষপদ্ধতি সম্পর্কে নিউটন মণ্ডল জানান, চারা রোপণের আগে জমি ভালোভাবে ১০ থেকে ১২ ইঞ্চি গভীর করে চাষ দিতে হয়। পাওয়ার টিলারে এত গভীর চাষ না হওয়ায় তিনি নিজস্ব প্রযুক্তিতে নাথনা বানিয়ে আট থেকে ১০ দিন ধরে জমি তৈরি করেন। ৫০ শতক জমির জন্য তিনি প্রায় ২০০ কেজি কেঁচো কম্পোস্ট বা ভার্মিকম্পোস্ট, ৭০ থেকে ৭৫ কেজি সরিষার খৈল এবং ৫০ কেজি টিএসপি সার ছিটিয়ে এক সপ্তাহ পচিয়ে মাটি প্রস্তুত করেন। এরপর জানুয়ারির শুরুতে চারা রোপণ করলে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকেই ধারাবাহিকভাবে লতি তোলা শুরু হয়।

ক্ষেতে কোনো ক্ষতিকর রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করেন না এই কৃষক। ক্ষতিকর মাকড় ও পোকার আক্রমণ ঠেকাতে তিনি নিয়মিত মেহগনির তেল স্প্রে করেন। চারা লাগানোর পর সপ্তাহে অন্তত একদিন নিয়মিত সেচ দিতে হয়, যাতে মাটিতে ফাটল না ধরে। নিউটন জানান, মাটি ফেটে গেলে কচুর বৃদ্ধি থেমে যায়। প্রতি ছয় দিন পর পর তিনি ক্ষেত থেকে প্রায় ছয় মণ করে লতি সংগ্রহ করেন। ভরা মৌসুমে প্রতি মণ লতি এক হাজার ৮০০ থেকে দুই হাজার টাকায় বিক্রি হয় এবং শেষ দিকে তা নেমে আসে এক হাজার ৬০০ টাকায়।

লতির পাশাপাশি এই কচুর ফুল ও মাঝের পাতাও সবজি হিসেবে বিক্রি হয়। দশটি ফুল দিয়ে তৈরি আঁটি ১০ টাকায় এবং দশটি কচি পাতা দিয়ে তৈরি শাকের আঁটি ১০ টাকায় বিক্রি করা হয়। একেকটি কাঁচা কচু জমি থেকেই পাইকারি ব্যবসায়ীরা ১২০ থেকে ১২৫ টাকায় কিনে নেন। এছাড়া পরিপক্ক গাছের ডগা ও উপরিভাগের অংশ কেটে শুকিয়ে প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে, যা রপ্তানি হচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়ায়। nরপ্তানিকারক বিশ্বজিৎ দত্ত কৃষি তথ্য সার্ভিসের মাধ্যমে নিউটনের যোগাযোগ নম্বর সংগ্রহ করে তার জমিতে আসেন এবং নারী শ্রমিকদের দিয়ে ডগা কাটিং ও শুকানোর প্রশিক্ষণ দেন।শুকনো এই কচু প্রতি কেজি ১২৫ টাকা দরে রপ্তানির জন্য নেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ায় প্রতি কেজিতে পাঁচ থেকে ১০ টাকা লাভ থাকে। নিউটনের লক্ষ্য পর্যায়ক্রমে পাঁচ হাজার কেজি প্রক্রিয়াজাত কচু রপ্তানির জন্য সরবরাহ করা। এর আগে দক্ষিণ কোরিয়ায় এই পণ্য মিয়ানমার থেকে আমদানি করা হতো। ৫০ শতক জমিতে কচুর চারা তৈরি, লতি, ফুল, পাতা এবং মূল গাছ বিক্রি করে বছরে সাড়ে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা আয় হয়।

এতে সার ও সেচ মিলিয়ে খরচ হয় মাত্র ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। গত মৌসুমে তিনি ৩৫ হাজার চারা বিক্রি করেছেন এবং বর্তমানে প্রায় এক লাখ চারা বিক্রির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। প্রতিটি চারা তিন টাকা দরে বিক্রি করে তিনি অতিরিক্ত তিন লাখ টাকা আয়ের আশা করছেন। লতির প্রতিটি গিট কেটে উঁচু জায়গায় রেখে এসব সুস্থ চারা তৈরি করা হয়।স্থানীয় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোসাদ্দেক হোসেন জানান, উপকূলীয় ডুমুরিয়ায় লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতা উভয় প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে এই কচু টিকে থাকতে পারে। কৃষি বিভাগ থেকে কৃষকদের ভার্মিকম্পোস্ট সরবরাহ এবং ক্ষতিকর কীটনাশকমুক্ত জৈব চাষাবাদের ওপর নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

ডুমুরিয়ার এই সাফল্য প্রমাণ করে, সঠিক জাত নির্বাচন ও বিষমুক্ত আধুনিক চাষাবাদের মাধ্যমে স্থানীয় সবজিকে আন্তর্জাতিক রপ্তানি পণ্যে রূপান্তর করা সম্ভব।