বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,
গ্রামীণ কুটির শিল্প

গফরগাঁওয়ের নকশি হাতপাখায় ফিরছে গ্রামীণ অর্থনীতি

কৃষি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬, ০৩:০৯ পিএম

গফরগাঁওয়ের নকশি হাতপাখায় ফিরছে গ্রামীণ অর্থনীতি

উপজেলার রাওনা ইউনিয়নের দীঘা বানেহালা এবং মশাখালি ইউনিয়নের মুখী গ্রামসহ বলদী ও লাউতৈল গ্রামে ঘরে ঘরে চলছে হাতপাখা তৈরির উৎসবমুখর ব্যস্ততা। একসময় কেবল পরিবারের ব্যবহারের জন্য তৈরি হলেও এখন তা রূপ নিয়েছে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক কুটির শিল্পে। সপ্তাহে কেবল মুখী, দীঘা ও বলদী গ্রামেই এক লাখেরও বেশি নকশি হাতপাখা তৈরি হয়। এখানকার কারিগরেরা মাঘ থেকে আশ্বিন—বছরের এই টানা নয় মাস পাখা তৈরির কাঁচামাল সংগ্রহ, উৎপাদন ও পাইকারি বিপণনের কাজে যুক্ত থাকেন।

নকশি পাখার মূল কাঠামো মূলত বাঁশের চাক বা চাকতি এবং হাতলের সমন্বয়ে তৈরি হয়। পুরুষ কারিগরেরা বাঁশ কেটে, চেঁছে সরু ও লম্বা বেতি তৈরি করেন। এরপর কাপড়ের ফিতা দিয়ে গোলাকার বাঁশের বেতি শক্ত করে পেঁচিয়ে তৈরি করা হয় পাখার বৃত্তাকার চাক। চাক তৈরি হয়ে গেলে বাকি অলংকরণ ও ধাপভিত্তিক কাজগুলোর বেশিরভাগই সম্পন্ন করেন নারী কারিগরেরা। প্রতিটি নকশি পাখা সম্পূর্ণ করতে পর্যায়ক্রমে পাঁচজন কারিগরের হাতের স্পর্শ লাগে। প্রথমজন বাঁশের চাক তৈরি করেন, দ্বিতীয়জন কাপড়ে ফুল তোলেন বা ছাপ দেন, তৃতীয়জন বৃত্তাকার মুড়ি বাঁধেন, চতুর্থজন কাপড়ের কুচি দিয়ে ঝালর লাগান এবং পঞ্চমজন বাঁশের হাতল বা ডাঁটি সেলাই করে জুড়ে দেন।

প্রায় তিন দশক আগে বলদী গ্রামের জামেনা খাতুন ওরফে জামু নামের এক নারী নিজের সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে এই নকশি পাখা তৈরির সূচনা করেছিলেন। পরবর্তীতে তার দেখানো পথ ধরে এই শিল্প গফরগাঁওয়ের গ্রামান্তরে ছড়িয়ে পড়ে। কাপড়ে সুঁই দিয়ে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে নকশা ভরাট করার প্রক্রিয়াকে স্থানীয়ভাবে বলা হয় চ্যালা। লাল, নীল, হলুদ, গোলাপি ও সাদা সুতার বৈচিত্র্যময় চ্যালায় ফুটে ওঠে শঙ্খলতা, কাঞ্চনমালা, তারাফুল, মনবিলাসী, শতফুল্লা, মনবাহার, বাঘবন্দি, পাশারদান ও সাগরদিঘির মতো চমৎকার সব নকশা। ফুলতোলা সুঁই-সুতার কাজের পাশাপাশি কম খরচে তৈরি করতে অনেক পাখায় কাপড়ের ওপর স্ক্রিন প্রিন্টের মাধ্যমে ছাপানো নকশাও ব্যবহার করা হয়। তৈরি পাখার প্রান্তে তৈরি পোশাক কারখানার ঝুট কাপড় কুচি করে ঝালর লাগানো হয়।

এই ঝালর পাখার সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি বাতাস চলাচলেও বিশেষ ভূমিকা রাখে। স্থানীয় বাজারে পাইকারদের কাছে প্রতিটি ছাপার পাখা ২০ থেকে ২৫ টাকায় এবং হাতে ফুলতোলা সুতার পাখা ৩০ থেকে ৩৫ টাকায় বিক্রি হয়। কোনো কোনো পাখায় একটি বা তিনটি ছোট আয়না বসিয়ে তৈরি করা হয় আয়না পাখা। প্রয়োজনীয় উপকরণ হাতে থাকলে একজন কারিগর দিনে গড়ে ১২ থেকে ১৫টি নকশি পাখা তৈরি করতে পারেন। চৈত্র মাস থেকে গরম বাড়ার সাথে সাথে সারাদেশে গফরগাঁওয়ের এই ঐতিহ্যবাহী নকশি হাতপাখার চাহিদা বাড়ে।

পাইকারদের হাত ধরে এসব পাখা পৌঁছে যায় দেশের বিভিন্ন শহর, গ্রাম ও প্রত্যন্ত হাটবাজারে। এছাড়া চৈত্র সংক্রান্তি ও বৈশাখী মেলাতেও এই পাখার ব্যাপক কদর থাকে। সুতিয়া নদীবিধৌত উর্বর ও নিসর্গধন্য এই জনপদের শত শত পরিবারে নকশি হাতপাখা এনে দিয়েছে স্থায়ী অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ও নারীর আত্মনির্ভরশীলতা।