সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬, ১১:৫৯ এএম
বিদেশে গিয়ে সর্বস্ব হারিয়ে শূন্য হাতে দেশে ফিরেছিলেন রাজবাড়ী জেলার কালুখালী উপজেলার বাংলাদেশ হাট এলাকার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর হোসেন। আজ তার বাড়ির আঙিনা মুখরিত বিশ্বের অর্ধশতাধিক দুর্লভ ও দামি জাতের বিদেশি মোরগ-মুরগি এবং সৌখিন পাখির কলকাকলিতে। এই বৈচিত্র্যময় খামার থেকে তিনি প্রতি মাসে গড়ে ৭০ হাজার থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করে দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন।
তার এই সফলতার পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ ও কঠিন সংগ্রামের ইতিহাস।জীবিকার তাগিদে প্রথমে মালদ্বীপে গিয়েছিলেন জাহাঙ্গীর। সেখানে ব্যবসায়িক ও আর্থিক বিপর্যয়ে পড়ে তিনি নিঃস্ব হয়ে যান। পরবর্তী সময়ে উন্নত দেশে যাওয়ার আশায় দালালের খপ্পরে পড়ে ভারতের চেন্নাইয়ে পৌঁছান। সেখানে দালাল পালিয়ে গেলে তিনি দীর্ঘ প্রায় সাত বছর চেন্নাইয়ের একটি উন্নত বিদেশি মুরগির খামারে বৈধভাবে কাজ করে প্রজনন ও খামার ব্যবস্থাপনার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। দেশে ফেরার সময় তিনি সেখান থেকে উপহার হিসেবে সিলকি ও ব্রাহমা জাতের দুই জোড়া মুরগি নিয়ে আসেন। শুরুতে শখের বশে বাড়ির আঙিনায় লালন-পালন শুরু করলেও ধীরে ধীরে দেশের বাজারে এর বাণিজ্যিক চাহিদা লক্ষ্য করেন। এরপর তিনি নিজের খামারটি বড় করতে থাকেন এবং বিদেশ থেকে বিশ্বের বিরল সব জাতের মোরগ-মুরগি ও পাখি সরাসরি আমদানি শুরু করেন। একপর্যায়ে তার খামারে জাতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১০৮টিতে, যার মধ্যে বর্তমানে অর্ধশতাধিক সেরা জাত স্থায়ীভাবে উৎপাদন পর্যায়ে রয়েছে।
জাহাঙ্গীরের খামারে সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে বিশালাকার কলম্বিয়ান ব্রাহমা জাতের মুরগি। রাজকীয় চেহারার এই মুরগির লেজ, গলা, ডানা ও পায়ের পাতা কালো হলেও বাকি পুরো শরীর ধবধবে সাদা। একজোড়া ব্রাহমা মুরগির ওজন ১২ থেকে ১৩ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। এর মধ্যে প্রতিটি মোরগ সাত থেকে আট কেজি এবং প্রতিটি মুরগি প্রায় ছয় কেজি ওজনের হয়। তবে মোরগের ওজন যাতে সাত কেজির ওপরে না যায়, সেজন্য বিশেষ ব্যবস্থাপনায় এদের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। ওজন খুব বেশি বেড়ে গেলে প্রজনন বা ব্রিডিংয়ে সমস্যা হয় এবং উর্বর ডিমের সংখ্যা কমে যায়।
এই মুরগি অত্যন্ত শান্ত ও মানুষের সঙ্গে সহজে মিশে যায়। বাণিজ্যিকভাবে এটি একই সাথে মাংস ও ডিমের জন্য অত্যন্ত কার্যকর। ব্রাহমা মুরগি বছরে ১২০ থেকে ১৫০টি ডিম দেয়। এরা টানা ২৪ ঘণ্টায় ১২০ থেকে ১৫০ গ্রাম দানাদার ফিড বা সাধারণ দেশি খাবার গ্রহণ করে। এর মাংসের আঁশ অত্যন্ত শক্ত ও ঘন হওয়ায় তা ব্রয়লারের চেয়ে অনেক বেশি সুস্বাদু এবং স্বাদে খাসির মাংসের মতো লাগে। বিপরীতে তার খামারে রয়েছে প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় মাত্র ১৫০ থেকে ২০০ গ্রাম ওজনের মালয়েশিয়ান সেরা জাতের সেরেমা মুরগি। বিশ্বের সবচেয়ে ছোট এই মুরগির একটি মোরগের ওজন ২০০ থেকে ২৫০ গ্রাম হয়, যা বড় আকারের দুটি কোয়েল পাখির ওজনের সমান। সরাসরি বিদেশ থেকে আমদানি করলে এই জাতের এক জোড়ার দাম ৭০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত পড়ে। তবে বর্তমানে জাহাঙ্গীর তার খামারে উৎপাদিত সেরেমা মুরগির মানভেদে প্রতিটি জোড়া ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি করেন। এই জাতের মুরগি বছরে ৭০ থেকে ৮০টি ডিম দেয় এবং এর প্রতিটি বাচ্চা বিক্রি হয় পাঁচশত টাকায়। যুক্তরাজ্যের ঐতিহ্যবাহী জাতের মধ্যে রয়েছে বাটারকাপ ও বিশালাকার বাফ অরপিংটন। বাটারকাপ মুরগির মাথার দুটি লাল ঝুঁটি দেখতে অবিকল প্রজাপতির ডানার মতো। এর প্রতিটি বাচ্চার দাম পাঁচশত টাকা। অন্যদিকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জাত হিসেবে পরিচিত বাফ অরপিংটন মোরগের ওজন হয় পাঁচ থেকে ছয় কেজি। মাংসের জন্য অত্যন্ত উন্নত এই মুরগি পূর্বে প্রতি জোড়া কয়েক লাখ টাকায় বিক্রি হলেও এখন প্রাপ্তবয়স্ক জোড়া ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকায় এবং বিশেষ মিউটেশনের ক্ষেত্রে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। এর প্রতি পিস বাচ্চার দাম এক থেকে দুই হাজার টাকা। পোল্যান্ডের বাফিজল পলিশ ক্যাপ মুরগি তার খামারের আরেকটি বড় আকর্ষণ।
এই মুরগির মাথার ওপর বিশেষ ধরনের ঝুঁটি থাকায় একে দূর থেকে ক্যাপ পরা মানুষের মতো দেখায়। এদের ১০ থেকে ১২টি শারীরিক রঙের রূপভেদ রয়েছে, যার সাত থেকে আটটি ভ্যারাইটি জাহাঙ্গীরের খামারে রয়েছে। এই জাত বছরে ৬০ থেকে ১০০টি পর্যন্ত ডিম দেয়। এদের প্রতি পিস বাচ্চা এক হাজার টাকা এবং প্রাপ্তবয়স্ক জোড়া ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। পুরো শরীর, মুখ, ঝুঁটি, জিহ্বা ও চোখের মণি কালো রঙের ইন্দোনেশিয়ার দুর্লভ জাত আয়াম সেমানিও রয়েছে এই খামারে। চার থেকে পাঁচ কেজি ওজনের অত্যন্ত শক্তিশালী এই জাতটিকে ইন্দোনেশিয়ার স্থানীয় ভাষায় `কালো মুরগি` বলা হয়। পাশাপাশি রয়েছে জাপানের জাতীয় পাখি গোল্ডেন ও রিংনেক ফিজেন্ট। গলায় সাদা বলয় ও মাথায় শিংয়ের মতো ঝুঁটি থাকা রিংনেক ফিজেন্টের লেজ বেশ লম্বা হয় এবং এর প্রতিটি বাচ্চা পাঁচশত টাকায় বিক্রি হয়। খামারে থাকা আরেকটি বিরল হলুদ ফিজেন্টের বাজারমূল্য জোড়াপ্রতি প্রায় ছয় হাজার টাকা। লোমের কোমলতার দিক থেকে অনন্য যুক্তরাষ্ট্রের সুলতান ও সিলকি মুরগি। বিড়ালের মতো অত্যন্ত নরম লোমশ শরীরের সিলকি জাতটি দেশে সবচেয়ে কম খরচে পাওয়া যায়, যার প্রতিটি বাচ্চা দুইশত থেকে তিনশত টাকায় মেলে। তবে রাজকীয় সুলতান জাতের প্রতিটি বাচ্চার দাম চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা এবং আট থেকে ১০ মাস বয়সী পূর্ণাঙ্গ জোড়ার দাম ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ওঠে। খামারে সব সময় এক জোড়া মোরগ-মুরগি হিসেবে বিক্রি করা হয়।
শুধু মুরগিই নয়, জাহাঙ্গীরের খামারে প্রজনন করানো হচ্ছে জাতীয় চিড়িয়াখানা থেকে সংগৃহীত ভারতীয় নীল ময়ূর। তিনি জানান, খামারে ১০টি পর্যন্ত ময়ূর পালনে কোনো আলাদা প্রশাসনিক অনুমতির প্রয়োজন হয় না। চিড়িয়াখানা থেকে বাচ্চা কিনে আনার পর প্রাপ্তবয়স্ক হতে এবং ডিম পাড়ার উপযোগী হতে প্রায় তিন বছর সময় লাগে। বর্তমানে তার খামারে থাকা ডিমপাড়া প্রাপ্তবয়স্ক ময়ূরের জোড়া এক লাখ থেকে এক লাখ ২০ হাজার টাকায় এবং বয়সভেদে বাচ্চা ৪০ থেকে ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। পেখমযুক্ত পুরুষ ময়ূরকে সাধারণ মুরগির মতোই ধান, গম, ভুট্টা ও সূর্যমুখী ফুলের বীজ খেতে দেওয়া হয়। খামারে এছাড়াও সিলভার ফিজেন্ট, উড ডাক ও হুইসেল ডাকসহ বিভিন্ন জাতের বিরল জলচর পাখি পালন করা হচ্ছে।
অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও নিজস্ব ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তিনি সারাদেশে এসব সৌখিন পাখি ও মুরগির বাচ্চা এবং প্রাপ্তবয়স্ক জোড়া বিক্রি করেন। শূন্য থেকে শুরু করে নিজের অদম্য ইচ্ছা ও দীর্ঘদিনের খামার ব্যবস্থাপনার বাস্তব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে রাজবাড়ীর এই যুবক আজ দেশের সৌখিন পোল্ট্রি খাতে একটি অনুকরণীয় স্বনির্ভর উদ্যোগ গড়ে তুলেছেন।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন