সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬, ০৫:১৯ পিএম
গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরে কুকুরের কামড়ে সাত বছর বয়সী এক কন্যাশিশুর মৃত্যু এবং সুন্দরগঞ্জে একটি উন্মত্ত শিয়ালের কামড়ে নারী-শিশুসহ নয়জন আহত হওয়ার ঘটনায় প্রাদুর্ভাবের উৎস ও কারণ অনুসন্ধানে মাঠে নেমেছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের রোগতত্ত্ব বিভাগের উচ্চপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ দল। একই সঙ্গে সুন্দরগঞ্জে একটি অসুস্থ গাভীর মাংস কাটায় অংশ নেওয়া বেশ কয়েকজনের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ হিসেবে ফোসকা দেখা দেওয়ার ঘটনাটিও নিবিড় পর্যবেক্ষণে নিয়েছে এই বিশেষজ্ঞ টিম।
ঢাকা ও রংপুরের সমন্বয়ে গঠিত এই দল দিনব্যাপী আক্রান্ত এলাকাগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করেছে।
গাইবান্ধা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. জোবাইদুল কবীর জানান, মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সাদুল্লাপুর ও সুন্দরগঞ্জের উপদ্রুত তিনটি এলাকায় ঘুরে তথ্য ও বিভিন্ন জৈব নমুনা সংগ্রহ করেছে পর্যবেক্ষক দলটি। চার সদস্যের এই বিশেষজ্ঞ দলের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন রংপুর বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের উপ-প্রধান রোগতত্ত্ববিদ ডা. রফিকুল আলম। দলের অন্য সদস্যরা হলেন ঢাকার ভাইরোলজি অনুবিভাগের ডা. সাজেদুল হায়াত, রোগতত্ত্ব অনুবিভাগের ডা. কামরুন্নাহার আকতার এবং স্ট্রাইডস বাংলাদেশের একজন প্রতিনিধি।
সাদুল্লাপুরে কুকুরের কামড়ে শ্বাসনালী ক্ষতবিক্ষত হয়ে এক শিশুর মৃত্যু হয়। গত ২১ সেপ্টেম্বর বিকেলে সাদুল্লাপুর উপজেলার কামারপাড়া ইউনিয়নের উত্তর হাটবামুনী গ্রামের বাসিন্দা সনজু মিয়ার সাত বছর বয়সী মেয়ে সিনথিয়া আক্তার প্রাইভেট পড়ে বাড়ি ফিরছিল। পথে একটি কুকুর তাকে ধাওয়া করে হঠাৎ গলায় কামড়ে ধরে। এতে শিশুটির শ্বাসনালীতে গভীর রক্তক্ষরণজনিত ক্ষত তৈরি হয়। একই সময় কুকুরটি উত্তর হাটবামুনী এলাকার আকবার আলীর ছেলে এবং স্থানীয় হোটেল শ্রমিক রাকিব হোসেনের (২৬) হাতে কামড় দিয়ে তাকেও গুরুতর জখম করে। স্থানীয় লোকজন ও স্বজনরা দ্রুত তাদের উদ্ধার করে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক শিশু সিনথিয়াকে মৃত ঘোষণা করেন।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ জানায়, আক্রমণের পরপরই বিক্ষুব্ধ জনতা ঘাতক কুকুরটিকে পিটিয়ে মেরে মাটিতে পুঁতে ফেলে। সাদুল্লাপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. তানভীক জাহান জানান, কুকুরটি জলাতঙ্ক বা র্যাবিসে আক্রান্ত ছিল কি না তা নিশ্চিত করতে মাটিতে পুঁতে রাখা মৃত কুকুরের শরীর থেকে প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
অন্যদিকে সুন্দরগঞ্জে একটি শিয়ালের তাণ্ডবে চার শিশুসহ নয়জন আহত হয়েছেন। গত ২০ সেপ্টেম্বর বিকেলে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বেলকা ইউনিয়নের জিগাবাড়ী ও তালুক বেলকা গ্রামে একটি ক্ষিপ্ত শিয়াল হঠাৎ লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে শিয়ালটি পথচারী এবং বাড়ির আঙিনায় থাকা মানুষের ওপর চড়াও হয়ে মুখ, ঠোঁট, কপাল ও হাতে কামড় বসায়। একই সাথে শিয়ালটি দুটি গরুকেও কামড়ে জখম করে। আহতরা হলেন জিগাবাড়ী গ্রামের মুকুল মিয়ার স্ত্রী রাবেয়া বেগম (৩৮), তার ছেলে রাকিবুল হাসান (১৩), ইয়াকুব আলীর ছেলে এনামুল হক (২৬), আব্দুল আহাদ আলীর মেয়ে আয়শা আক্তার (৩), মো. আব্দুর রহিমের ছেলে হাসান মিয়া (৭), তালুক বেলকা গ্রামের জমশের আলীর স্ত্রী লিলি বেগম (৩৫), মৃত কামাল উদ্দিনের ছেলে সাদেক হোসেন (৭০), আব্দুল হান্নান মিয়ার স্ত্রী আফরুজা বেগম (৩৭) এবং শফিউল ইসলামের ছেলে শাওন মিয়া (৬)।
প্রত্যক্ষদর্শী ও আহত লিলি বেগমের স্বজন ইসমোতারা বেগম জানান, আসরের আজানের সময় ফসলি জমির আইলে প্রতিবেশি প্রবীণ সাদেক হোসেনকে শিয়ালটি কামড়াতে থাকলে লিলি বেগম তাকে উদ্ধারে এগিয়ে যান। তখন শিয়ালটি লিলি বেগমের কপালে কামড়ে মাংসের অংশ ছিঁড়ে নেয় এবং সাদেক হোসেনের মুখমণ্ডল ও কপালে ক্ষত তৈরি করে। পরবর্তীতে স্থানীয় গ্রামবাসী ধাওয়া করে শিয়ালটিকে পিটিয়ে মেরে ফেলে এবং আহতদের উদ্ধার করে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করায়।
এর আগে সুন্দরগঞ্জে অসুস্থ গাভীর মাংস কাটতে গিয়ে অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ দেখা দেয়।
গত ১১ সেপ্টেম্বর সুন্দরগঞ্জ উপজেলার পূর্ব বাছহাটি গ্রামের মঞ্জুরুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তির অসুস্থ ফ্রিজিয়ান জাতের গাভী জবাই করার পর মাংস কাটার প্রক্রিয়ায় এলাকার নারী ও পুরুষরা অংশ নেন। এর কয়েকদিন পর প্রথমে চারজন এবং পরবর্তীতে প্রায় ১০ থেকে ১৫ জনের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ক্ষত ও ফোসকা দেখা দেয়। আক্রান্তরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিলে চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেন যে লক্ষণগুলো অ্যানথ্রাক্স সংক্রমণের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা জানান, সুন্দরগঞ্জের মারা যাওয়া শিয়ালের মাথা এবং সাদুল্লাপুরের কুকুরের নমুনা সেন্ট্রাল ডিজিজ ইনভেস্টিগেশন ল্যাবরেটরি বা কেন্দ্রীয় রোগ অনুসন্ধান গবেষণাগারে (সিডিআইএল) পাঠানো হয়েছে। রোগতত্ত্ব দল মাঠপর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে মূল ঝুঁকি নির্ধারণের কাজ করছে।
চিকিৎসকরা জলাতঙ্কের ঝুঁকি নিয়ে জরুরি স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন।
ফুলছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. তানভীর রহমান কল্লোল জানান, জলাতঙ্ক একটি অত্যন্ত মারাত্মক ভাইরাসজনিত ব্যাধি, যা স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে দ্রুত মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ে। কামড়ের ক্ষতস্থান মাথার যত কাছে হবে, সংক্রমণের গতি তত দ্রুত হবে এবং রোগটি পুরোপুরি প্রকাশ পেলে মৃত্যু প্রায় নিশ্চিত। তিনি পরামর্শ দেন, কুকুর বা শিয়ালের মতো প্রাণী কামড়ালে তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষতস্থানটি সাবান ও বহমান পানি দিয়ে টানা ১৫ থেকে ২০ মিনিট ধরে পরিষ্কার করতে হবে এবং অনতিবিলম্বে সরকারি কেন্দ্র থেকে প্রতিষেধক টিকা গ্রহণ করতে হবে। ক্ষতের গভীরতা বেশি হলে টিকার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ইমিউনোগ্লোবুলিন (আরআইজি) প্রয়োগ বাধ্যতামূলক।
উপজেলা প্রশাসন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
সাদুল্লাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিজ রওজাতুন জান্নাত জানান, আক্রান্ত এলাকা পরিদর্শন করে উপজেলার সকল বেওয়ারিশ ও গৃহপালিত কুকুরকে টিকাদানের আওতায় আনার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত টিকা মজুত রয়েছে জানিয়ে তিনি স্থানীয়দের আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকার আহ্বান জানান।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ২২ এপ্রিল সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে একটি উন্মুক্ত পাগলা কুকুরের কামড়ে আক্রান্তদের মধ্যে টিকা গ্রহণের পরও ৬ মে থেকে ১৩ মে পর্যন্ত এক সপ্তাহের ব্যবধানে তিন নারী ও দুই পুরুষসহ মোট পাঁচজনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছিল।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন