রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

পীরগঞ্জে অ্যানথ্রাক্স উপসর্গে ৯ রোগী শনাক্ত

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ২২, ২০২৫, ০১:৩৬ পিএম

পীরগঞ্জে  অ্যানথ্রাক্স উপসর্গে ৯ রোগী শনাক্ত

ছবি - সংগৃহীত

রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলায় গবাদিপশুর সংক্রামক রোগ অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে নয়জন রোগীকে শনাক্ত করা হয়েছে। মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর, এই ঘটনা জানাজানি হলে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক উদ্বেগ দেখা দেয়। শনাক্ত হওয়া রোগীদের মধ্যে পাঁচজন প্রথমে পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসেন এবং পরবর্তী সময়ে স্বাস্থ্য বিভাগের একটি বিশেষ মেডিকেল টিম গ্রামে গিয়ে আরও চারজনকে শনাক্ত করে।

এই ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে প্রায় দশ দিন আগে জবাই করা একটি অসুস্থ গরুর মাংস খাওয়াকে কেন্দ্র করে। উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, রোগীদের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ল্যাবে পাঠানো হয়েছে এবং আক্রান্ত গ্রামগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাসুদ রানা এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, মঙ্গলবার সকালে উপজেলার রামনাথপুর ইউনিয়নের দ্বারিয়াপুর গ্রাম থেকে পাঁচজন রোগী ত্বকের বিশেষ উপসর্গ নিয়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসেন।

তাদের প্রাথমিক লক্ষণ, বিশেষ করে ত্বকে ফোঁড়ার মতো ঘা দেখে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের অ্যানথ্রাক্স বলে সন্দেহ হয়। তাৎক্ষণিকভাবে এই পাঁচজনের নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষ দ্রুত একটি চার সদস্যের মেডিকেল টিম গঠন করে। এই টিমকে দ্রুত দ্বারিয়াপুর গ্রামে পাঠানো হয় এই উপসর্গের আরও রোগী আছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে।

মেডিকেল টিম গ্রামে পৌঁছানোর পর সেখানে অনুসন্ধান চালিয়ে একই ধরনের উপসর্গসহ আরও চারজন ব্যক্তিকে খুঁজে পায়।গ্রামে গিয়ে খোঁজখবর নিয়ে মেডিকেল টিম এবং স্থানীয় সূত্রগুলো ঘটনার উৎস সম্পর্কে জানতে পারে। জানা গেছে, গত ১১ অক্টোবর দ্বারিয়াপুর গ্রামের বাসিন্দা মোছা. আশুরা বেওয়া (৬৫) নামের এক নারী তার পালিত একটি অসুস্থ গরুকে জবাই করেন। পরবর্তীকালে সেই গরুর মাংস তিনি নিজের পরিবার এবং আশপাশের প্রতিবেশীদের মধ্যে বিতরণ করেন।

ওই মাংস খাওয়ার কয়েকদিন পর থেকেই এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শরীরে নানা ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে শুরু করে। তথ্য অনুযায়ী, গত ১৪ অক্টোবর থেকেই আশুরা বেওয়াসহ প্রথম কয়েকজনের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের লক্ষণ, বিশেষ করে ত্বকে চুলকানি ও পরবর্তীতে ঘা বা ফোঁড়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। কিন্তু তারা বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। অবশেষে মঙ্গলবার তাদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে এবং একাধিক ব্যক্তি একই ধরনের উপসর্গে আক্রান্ত হওয়ায় তারা হাসপাতালে আসেন। তখনই পুরো ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে এবং স্বাস্থ্য বিভাগের নজরে আসে।

স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, শনাক্ত হওয়া নয়জন রোগীই দ্বারিয়াপুর ও পার্শ্ববর্তী চেরাগপুর গ্রামের বাসিন্দা। তারা হলেন দ্বারিয়াপুর গ্রামের মোছা. আশুরা বেওয়া (৬৫), রবিউল ইসলাম (৫৫), শহীদ মিয়া (২৩), শরিফ মিয়া (২২), খাসা মিয়া (৫২), শিল্পী খাতুন (২৮), আল মামুন মিয়া (১৬) এবং খোরশেদ আলী (২৫)। এ ছাড়া চেরাগপুর গ্রামের রওহাবুল মিয়া (৩২) নামের আরও একজন শনাক্ত হয়েছেন, যিনি সম্ভবত ওই মাংসের সংস্পর্শে এসেছিলেন বা তা গ্রহণ করেছিলেন।

স্বাস্থ্য বিভাগ বর্তমানে এই নয়জনের একটি তালিকা তৈরি করে তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা প্রদান করছে। একইসাথে ওই অসুস্থ গরুর মাংস আর কারা গ্রহণ করেছেন, কারা মাংস কাটা বা ধোয়ার কাজে জড়িত ছিলেন, তাদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাসুদ রানা এই পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেন, অ্যানথ্রাক্স উপসর্গের মোট নয়জন রোগীকে শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাদের চিকিৎসা চলছে।

তিনি জনগণকে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, অ্যানথ্রাক্স একটি ব্যাকটেরিয়াঘটিত রোগ হলেও এটি সাধারণত মানুষের থেকে মানুষের মধ্যে সহজে ছড়ায় না। অর্থাৎ, আক্রান্ত রোগীর সেব শুশ্রূষা করলে বা তাদের সংস্পর্শে এলে অন্য মানুষের সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি নেই বললেই চলে। এই রোগটি মূলত ‘ব্যাসিলাস অ্যানথ্রাসিস’ নামক ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে ঘটে এবং এটি একটি জুনোটিক ডিজিজ বা প্রাণিবাহিত রোগ।

এটি সাধারণত সংক্রামিত প্রাণীর (বিশেষত গরু, ছাগল, ভেড়া) সংস্পর্শে আসা, পশম নাড়াচাড়া করা বা ওই প্রাণীর অপরিশোধিত বা ভালোভাবে সিদ্ধ না করা মাংস খাওয়ার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ছড়াতে পারে। ত্বকের মাধ্যমে সংক্রমণ ঘটলে সাধারণত ফোঁড়ার মতো হয়ে কালচে দাগ পড়ে, যা এই রোগীদের ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে দেখা গেছে। মেডিকেল টিম ওই এলাকায় সক্রিয় রয়েছে এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

একই সঙ্গে, উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগকেও বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে, যাতে ওই এলাকার অন্যান্য গবাদিপশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা যায় এবং অ্যানথ্রাক্সের সম্ভাব্য উৎস সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করা যায়। ল্যাবরেটরি থেকে নমুনা পরীক্ষার চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর এই নয়জনের অ্যানথ্রাক্স সংক্রমণের বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। এই ঘটনা আবারও অসুস্থ বা অজানা কারণে মারা যাওয়া পশুর মাংস গ্রহণ না করার বিষয়ে জনসচেতনতার গুরুত্বকে সামনে নিয়ে এসেছে।