অক্টোবর ২২, ২০২৫, ০৬:০৬ পিএম
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত মান নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, গত ১৬ বছরে দেশে কাগজে-কলমে শিক্ষার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেলেও শিক্ষার প্রকৃত মান বাড়েনি। এই মানহীন শিক্ষার কারণেই দেশে বিপুল সংখ্যক উচ্চশিক্ষিত তরুণ আজ বেকারত্বের অভিশাপে ভুগছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বুধবার, ২২ অক্টোবর, দুপুরে উপমহাদেশে অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষার প্রবক্তা এবং চট্টগ্রাম পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান নুর আহমদ চেয়ারম্যানের ৬১তম মৃত্যুবার্ষিকীতে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। মেয়র এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি এবং কর্মমুখী শিক্ষায় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেন। একইসঙ্গে তিনি বিদেশে কর্মরত প্রবাসীদের দক্ষতা বৃদ্ধির ওপরও জোর দেন, যাতে তারা অদক্ষ শ্রমিকের পরিবর্তে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে দেশের অর্থনীতিতে আরও বেশি অবদান রাখতে পারেন।
মরহুম নুর আহমদ চেয়ারম্যানের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের এই অনুষ্ঠানে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন তার অবদানের কথা স্মরণ করে বলেন, নুর আহমদ চেয়ারম্যান ৩৩ বছর পৌরসভার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করে পৌরসভার এক নবদিগন্তের সূচনা করেছিলেন। বিশেষ করে অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তনে তিনি যে যুগান্তকারী অবদান রেখেছেন, তা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। মেয়র বলেন, চট্টগ্রামবাসীসহ সারা দেশে সমাজ সংস্কারে তিনি যে কাজগুলো করে গেছেন, তার সুফল দেশের মানুষ এখনো ভোগ করে যাচ্ছে।
এই মহান শিক্ষানুরাগীর স্মৃতিকে তরুণ প্রজন্মের কাছে চিরস্মরণীয় করে রাখতে চট্টগ্রাম নগরীতে তার নামে একটি গোলচত্বর করারও ঘোষণা দেন সিটি মেয়র। চসিক সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এই সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মেয়র দেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে নুর আহমদ চেয়ারম্যানের দূরদৃষ্টির তুলনা করেন।
শিক্ষার মান নিয়ে নিজের পর্যবেক্ষণের বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে চসিক মেয়র বলেন, বিগত বছরগুলোতে পাসের হার বৃদ্ধি এবং জিপিএ-৫ এর সংখ্যা বৃদ্ধিকে শিক্ষার অগ্রগতি হিসেবে দেখানো হলেও, কর্মক্ষেত্রে গিয়ে এই উচ্চশিক্ষিতরা বারবার ব্যর্থ হচ্ছেন। এর মূল কারণ হলো, তাদের যে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে তা বাস্তব জীবনের চাহিদা বা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চাকরির বাজারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।
তিনি বলেন, কেবল সার্টিফিকেটসর্বস্ব শিক্ষা দিয়ে একটি জাতিকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষিত বেকার আজ পরিবার ও সমাজের বোঝায় পরিণত হচ্ছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে দেশের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনসংখ্যাতাত্ত্বিক লভ্যাংশ কাজে লাগানো যাবে না, উল্টো তা বিপর্যয় ডেকে আনবে। মেয়র তাই প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার করে কর্মমুখী ও কারিগরি শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
এই প্রসঙ্গে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ব্যতিক্রমী ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অন্য সিটি করপোরেশনগুলোর মধ্যে একমাত্র চসিকই শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতে অন্য যেকোনো সংস্থার চেয়ে বেশি বিনিয়োগ করে থাকে। এটি চসিকের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। তিনি জানান, বর্তমানে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন মোট ৮৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে, যার মাধ্যমে প্রায় ৬৫ হাজার শিক্ষার্থীকে আধুনিক ও মানসম্মত শিক্ষায় শিক্ষিত করার চেষ্টা চলছে।
এই বিশাল শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে চসিককে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ ভর্তুকি দিতে হয়। মেয়র বলেন, এই ভর্তুকিকে তিনি কখনোই ‘ব্যয়’ হিসেবে দেখেন না, বরং এটিকে তিনি ‘বিনিয়োগ’ হিসেবেই গণ্য করেন। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, এই শিক্ষা খাতে প্রতি মাসে চসিককে ছয় থেকে আট কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়, যা আসলে দেশের ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ। কারণ, এই শিক্ষার মাধ্যমে শিশুদের যদি সুনাগরিক এবং দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তবে তারাই ভবিষ্যতে চট্টগ্রাম ও সর্বোপরি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে প্রধান ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
তিনি নগরীর শিক্ষাখাতকে ঢেলে সাজাতে সব ধরনের সহযোগিতার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।আলোচনা সভায় মরহুম নুর আহমদ চেয়ারম্যানের বর্ণাঢ্য জীবনের ওপর স্মৃতিচারণ করেন তার দৌহিত্র এস এম সালাউদ্দীন। অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আশরাফুল আমিন, প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তা ড. কিসিঞ্জার চাকমা, নূর আহমদের আরেক দৌহিত্র এস এম নাসিরুদ্দিন আল মামুনসহ চসিকের বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা, কাউন্সিলর এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
সভাটি নিছক একটি স্মরণসভা ছিল না, এটি চট্টগ্রামের শিক্ষা ব্যবস্থার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে পর্যালোচনার এক গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে পরিণত হয়, যেখানে মেয়রের বক্তব্যই ছিল প্রধান আলোচনার বিষয়।




দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন