মোঃফরহাদ হোসেন
অক্টোবর ২৩, ২০২৫, ০২:২৬ পিএম
ছবি-দিনাজপুর টিভি
দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার সীমান্তঘেষা পলাশবাড়ী ইউনিয়নের বৈরবাড়ী, চাপাপাড়া ও হিরামণি মৌজার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর ঐতিহ্যবাহী ঢেমঢেমিয়া কালিমেলা। দেড়শ বছরের বেশি সময় ধরে টিকে থাকা এই মেলা উত্তরবঙ্গের লাখো মানুষের অন্যতম বিনোদন ও অর্থনৈতিক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
বাংলা ১২৮০ সাল থেকে শুরু হওয়া এই কালিমেলায় প্রতি বছর কার্তিক মাসের আমাবস্যা তিথিতে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। সাত দিনব্যাপী পূজা হলেও মেলার প্রাণ থাকে প্রায় মাসজুড়ে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এখানে মিলিত হয় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থেকে আসা মানুষজন।

তবে এই মেলার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ঘোড়া ও মহিষের। মেলা শুরুর আগেই দেশজুড়ে আলোচনায় আসে এই মেলাটি।
মূলত ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নীলফামারী,জামালপুর, নেত্রকোনা, রাজশাহী, নওগাঁ, রংপুরসহ আশপাশের জেলার ক্রেতা-বিক্রেতারা নিজেদের পছন্দের ঘোড়া ও মহিষ নিয়ে হাজির হন এখানে।
মাঠজুড়ে ঘোড়ার টগবগে ছুট, বিক্রেতাদের আহ্বান আর ক্রেতাদের দরদাম সব মিলিয়ে এক অন্যরকম দৃশ্য। ঘোড়ার কর্মদক্ষতা আর চেহারার ওপর ভিত্তি করে দেওয়া হয় বাহারি নাম পারলে ঠেকাও,কিরণমালা, পঙ্খিরাজ, মায়াবতী, বাহাদুর রাণী, সম্রাট যেন ঘোড়াগুলোরও নিজস্ব পরিচয় আছে।
ঘোড়া বিক্রির আগে বিক্রেতারা খোলা মাঠে দেখান ঘোড়ার দৌড়, বুদ্ধি, কর্মদক্ষতা আর গতি এরপর দরদাম ঠিক হয় তবে মেলায় যে ঘোড়াটির গুণ ও কর্মদক্ষতা বেশি তার দাম বেশি।
এ বছর মেলায় ছোট জাতের ঘোড়ার চাহিদাই সবচেয়ে বেশি জাত ভেদে ৫ হাজার থেকে ৪ লাখ টাকার পর্যন্ত বিভিন্ন জাতের ঘোড়া কেনা বেচা হচ্ছে এই মেলায়।

নওগাঁ জেলায় ধামরহাট থেকে ঘোড়া নিয়ে মেলায় এসেছেন শামসুল আলম তিনি বলেন, আমি ছোট বড় বিভিন্ন জাতের ঘোড়া নিয়ে মেলা এসেছি ৭ টার মত বিক্রি করেছি বাকিগুলো বিক্রি হবে আশা করছি দাম পেয়েছি বেশ ভালো তবে মেলায় ছোট ঘোড়ার চাহিদাই সবচেয়ে বেশি এবং ক্রেতাদের সমাগমও ভালো ।
ঘোড়ার অন্য পাশেই সারি সারি কালো কুচকুচে মহিষ। শতশত মহিষ বাঁধা মাঠজুড়ে, চলছে ক্রেতাদের দরদাম ও পছন্দের দৌড়ঝাঁপ।
জামালপুর থেকে আসা মহিষ ক্রেতা শাহিদুল ইসলাম বলেন, আমি এই মেলা দুই জোড়া মহিষ কিনেছি ১০ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা তবে এবার মহিষ আমদানি বেশি হওয়ার পরও মহিষের বাজার একটু বেশি।
ঘোড়া-মহিষের হাট ছাড়াও মেলায় বসেছে গ্রামের ঐতিহ্যবাহী পণ্যের দোকান। ঘোড়ার গাড়ি, লাগাম, জোয়াল, লাঙ্গলসহ কৃষি কাজে ব্যবহৃত নানা সরঞ্জামের পাশাপাশি পাওয়া যাচ্ছে খেলনাসামগ্রী, মিঠাই-মিষ্টান্ন, হাতে তৈরি অলঙ্কার ও নাগরদোলাসহ শিশুদের বিনোদনের নানান পন্য সামগ্রী।
ঢেমঢেমিয়া কালিমেলা উত্তরবঙ্গের মানুষের সংস্কৃতি, ধর্মীয় অনুশাসন ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত দলিল। দেড়শ বছর ধরে টিকে থাকা এই মেলা আজও স্মরণ করিয়ে দেয় গ্রামীণ বাংলার প্রাণচাঞ্চল্য এখনো জীবন্ত, এখনো টিকে আছে মানুষের ভেতরের উৎসবপ্রাণতা।