অক্টোবর ২, ২০২৬, ১০:৫০ এএম
স্বর্ণ বললেই সাধারণত অলংকার কিংবা আর্থিক বিনিয়োগের চিত্র ভেসে ওঠে। তবে এই মূল্যবান ধাতুটির ব্যবহার কেবল গয়না বা সিন্দুকে জমানো বার ও কয়েনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। একবিংশ শতাব্দীতে এসে মানুষের হাতের স্মার্টফোন থেকে শুরু করে মহাকাশযান, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এমনকি বিলাসবহুল খাবারের থালায়ও স্বর্ণ গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নিয়েছে। ক্ষয় না হওয়া ও ভালো বিদ্যুৎ পরিবাহী হওয়ার কারণে স্বর্ণ অত্যন্ত কার্যকর।
সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো স্বর্ণ খাওয়ার প্রচলন। এটি খাওয়ার উপযোগী স্বর্ণ বা এডিবল গোল্ড হিসেবে পরিচিত। খাবারে ব্যবহৃত এই স্বর্ণ সাধারণত ২২ থেকে ২৪ ক্যারেট মানের বিশুদ্ধ হয়ে থাকে এবং অত্যন্ত সূক্ষ্ম পাত আকারে পরিবেশন করা হয়। সুশি, মিষ্টি, কেক, চকলেট ও আইসক্রিম সাজাতে এর ব্যবহার দেখা যায়। ইউরোপীয় ইউনিয়নে এটি ‘ই১৭৫’ নামে অনুমোদিত খাদ্য উপাদান।
তবে স্বর্ণ খেলে মানবদেহে বাড়তি কোনো পুষ্টি পাওয়া যায় না। দ্রাব্যতা অত্যন্ত কম হওয়ায় পরিপাকতন্ত্রে এটি শোষিত হয় না। ফলে খাবারে এর ব্যবহার মূলত রূপসজ্জা ও বিলাসিতার অংশ। দক্ষিণ এশিয়ায় মিষ্টিতে যে রুপালি বা সোনালি পাত ব্যবহার হয়, তা ‘ভারক’ বা ‘ওয়ার্ক’ নামে পরিচিত। খাবারে স্বর্ণ গ্রহণের স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে গবেষণা হয়েছে। ২০২৩ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, ইঁদুরকে নির্দিষ্ট মাত্রায় এই উপাদান খাওয়ানোর পর লিভার, প্লীহা বা অন্ত্রে সরাসরি কোনো ক্ষতি হয়নি। তবে মাত্রাতিরিক্ত স্বর্ণ গ্রহণের ফলে অন্ত্রের জীবাণু ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় পরিবর্তন এবং হালকা প্রদাহের প্রমাণ মিলেছে।
প্রযুক্তিপণ্য ও ইলেকট্রনিক সামগ্রীতে স্বর্ণের ভূমিকা অপরিহার্য। প্রতিটি স্মার্টফোন, কম্পিউটার ও ট্যাবলেটের সার্কিট বোর্ড, সুইচ ও সংযোগস্থলে অতি সামান্য পরিমাণ স্বর্ণ ব্যবহার করা হয়। এটি সহজে মরিচা ধরে না এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ পরিবহন সচল রাখে। বিশ্বজুড়ে বিপুল পরিমাণ যন্ত্র তৈরির কারণে ইলেকট্রনিক বর্জ্য থেকে স্বর্ণ সংগ্রহের আলাদা খাত গড়ে উঠেছে। মহাকাশ বিজ্ঞানেও স্বর্ণের প্রতিফলন ক্ষমতা কাজে লাগানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার তথ্যমতে, স্বর্ণ আলো ও তাপের ভালো প্রতিফলক।
এই বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের আয়নায় স্বর্ণের অতি সূক্ষ্ম প্রলেপ দেওয়া হয়েছে, যা দূর মহাবিশ্বের ইনফ্রারেড আলো শনাক্ত করতে সাহায্য করে। পাশাপাশি মহাকাশচারীদের হেলমেটের কাচেও সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি প্রতিহত করতে স্বর্ণের প্রলেপ থাকে। চিকিৎসাক্ষেত্রে বাত বা আর্থ্রাইটিসের পুরোনো চিকিৎসার পাশাপাশি এখন ক্যান্সার শনাক্তকরণে স্বর্ণের ব্যবহার নিয়ে কাজ চলছে। অতি ক্ষুদ্র গোল্ড ন্যানোপার্টিকল দিয়ে সরাসরি আক্রান্ত কোষে ওষুধ পৌঁছানো ও দ্রুত রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষার কিটে এটি ব্যবহার করা হচ্ছে। আমেরিকান ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, স্থায়িত্বের কারণে প্রাচীনকাল থেকে দাঁতের চিকিৎসায় স্বর্ণের সংকর ধাতুর ব্যবহার চলে আসছে।
অর্থনীতির মূল শক্তি হিসেবে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভে বিপুল স্বর্ণ মজুত রাখে। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ৮ হাজার ১৩৩ টন স্বর্ণ মজুত আছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের তথ্যমতে, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ইতালি ও ফ্রান্সের সম্মিলিত রিজার্ভ ছিল প্রায় ১৬ হাজার ৪০০ টন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন দ্রুত গতিতে স্বর্ণের মজুত বাড়াচ্ছে; দেশটির ভাণ্ডারে বর্তমানে দুই হাজার টনের বেশি স্বর্ণ রয়েছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন