এপ্রিল ১৮, ২০২৬, ০৭:৩৩ পিএম
বাউল সংগীত ও আধ্যাত্মিক সাধনার জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন ঘটেছে। না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন কিংবদন্তি সাধক ও শিল্পী কানাই দাস বাউল। আজ শনিবার সকালে পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার পবিত্র তীর্থস্থান তারাপীঠে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে এই মরমী শিল্পীর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।
প্রখ্যাত ভারতীয় চিত্রগ্রাহক ও নির্মাতা রঞ্জন পালিত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই প্রবীণ শিল্পীর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন।দীর্ঘদিন ধরেই বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন এই বাউল সাধক।
বিশেষ করে গত দুই মাস ধরে তিনি যক্ষ্মা বা টিবি রোগে আক্রান্ত ছিলেন। এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে ক্রনিক অ্যাজমা এবং ডায়াবেটিসজনিত সমস্যাও তাকে কাবু করে ফেলেছিল। অসুস্থতা বাড়তে থাকায় শেষ পর্যন্ত চিকিৎসারত অবস্থায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। তার প্রয়াণের খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে দুই বাংলার বাউল অনুরাগী ও ভক্তদের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
শারীরিক দৃষ্টিহীনতা কানাই দাসের আধ্যাত্মিক যাত্রায় কখনো বাধা হতে পারেনি। বাহ্যিক জগৎ দেখতে না পেলেও অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন জীবন, মানুষ ও মানবতার গভীর অর্থ। একতারা হাতে গ্রাম থেকে গ্রামান্তর, বিভিন্ন মেলা ও আখড়ায় ঘুরে তিনি জীবনভর গেয়েছেন অসাম্প্রদায়িক ও মানবতার গান। ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’ কিংবা ‘কে বলে মানুষ মরে, আমি বুঝলাম না ব্যাপার’— এমন বহু কালজয়ী গানের মাধ্যমে তিনি সাধারণ মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন।
কানাই দাসের কণ্ঠের মাধুর্য কেবল এ দেশেই সীমাবদ্ধ ছিল না। দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশের মাটিতেও তিনি বাউল গান পরিবেশন করে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। সংগীত ও লোকসংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের জন্য ২০১৯ সালে তাকে মর্যাদাপূর্ণ ‘সহজিয়া সম্মান’ প্রদান করা হয়। এমনকি প্রখ্যাত ব্রিটিশ লেখক উইলিয়াম ডালরিম্পলের বিশ্বখ্যাত বই ‘নাইন লাইভস’-এও এই শিল্পীর জীবনযুদ্ধ ও সুর সাধনা নিয়ে একটি বিশেষ অধ্যায় রয়েছে। ভক্তদের কাছে তিনি পরম মমতায় ‘কানাই বাবা’ নামেই পরিচিত ছিলেন।
এই মরমী শিল্পীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী পান্থ কানাই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করে তিনি লিখেছেন যে, কানাই বাবার কণ্ঠে ছিল মাটির অকৃত্রিম গন্ধ আর তার সাধনায় ছিল আত্মার নিরন্তর খোঁজ। তিনি শুধু গান গাইতেন না বরং মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসা, ভক্তি আর সত্যের বাণী পৌঁছে দিতেন। পান্থ কানাই মনে করেন, এই প্রস্থান সংগীত জগতে যে বিশাল শূন্যতা তৈরি করল তা সহজে পূরণ হবার নয়।
বাউল সংগীতের এই মহীরুহের প্রয়াণ কেবল একটি যুগের অবসান নয় বরং একটি দর্শনের সাময়িক নীরবতা। তবে গুণগ্রাহীদের মতে, বাহ্যিক দৃষ্টি না থাকলেও কানাই দাস বাউল যে গভীর জীবনদর্শনের বার্তা রেখে গেছেন তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেঁচে থাকবে। তার গাওয়া গানগুলো মানুষের ভেতরের মানুষকে খুঁজে পাওয়ার আহ্বান জানিয়ে যাবে চিরকাল। পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমসহ পুরো শিল্প মহলে এখন শোকের স্তব্ধতা বিরাজ করছে। লোকসংগীতের এই মহান সাধককে আজ শেষ বিদায় জানাচ্ছে তার অগণিত ভক্ত ও অনুসারীরা।


দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন