ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২৬, ০৭:১০ পিএম
পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এখন সরাসরি যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। বিতর্কিত ডুরান্ড লাইন সীমান্তে পাকিস্তানের সেনা চৌকিতে হামলার জের ধরে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা করেছে ইসলামাবাদ। এরই ধারাবাহিকতায় অপারেশন গজব-লিল হক নামে রাজধানী কাবুলসহ পাকতিকা ও কান্দাহার অঞ্চলে ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান বিমান বাহিনী।
এই পাল্টাপাল্টি হামলায় উভয় পক্ষের কয়েকশ সদস্য নিহত হওয়ার দাবি করা হলেও পরিস্থিতির ভয়াবহতা নির্দেশ করছে যে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যকার কয়েক দশকের মিত্রতা এখন চূড়ান্ত শত্রুতায় পরিণত হয়েছে।
বিশেষ করে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফের সরাসরি যুদ্ধের ঘোষণা এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।এই চরম বৈরিতার নেপথ্যে রয়েছে খাইবার পাখতুনখোয়া অঞ্চলে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপির ক্রমবর্ধমান হামলা।
ইসলামাবাদ দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে যে আফগান তালেবান সরকার টিটিপিকে তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দিচ্ছে এবং সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা করছে। সম্প্রতি বান্নু ও বাজাউর জেলায় বড় ধরনের হামলায় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মৃত্যুর পর পাকিস্তানের ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটে। পাকিস্তান মনে করে আফগানিস্তানের বর্তমান শাসক গোষ্ঠী তাদের দেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার চক্রান্তে লিপ্ত। তবে এই সম্পর্কের অবনতি রাতারাতি ঘটেনি; এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট যা সত্তর ও আশির দশকের সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের সময় থেকে শুরু হয়েছিল।
সত্তরের দশকে যখন আফগানিস্তানে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরু হয় তখন পাকিস্তান ছিল আফগানদের প্রধান আশ্রয়দাতা ও সহায়তাকারী দেশ। সেই সময় অর্থ অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে আফগান যোদ্ধাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল ইসলামাবাদ। কিন্তু ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। আল কায়েদাকে নির্মূল করতে মার্কিন বাহিনী যখন আফগানিস্তানে অভিযান শুরু করে তখন পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রকে কৌশলগত সহযোগিতা প্রদান করে।

তালেবানরা বিষয়টিকে তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে গণ্য করে এবং তখন থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে অবিশ্বাসের বীজ বপন করা হয়। ২০০৭ সালে টিটিপি গঠনের মূল উদ্দেশ্যই ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রকে মার্কিনপন্থী আখ্যা দিয়ে আক্রমণ করা। ২০১১ সালে ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুর পর এই সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করে।বর্তমানে আফগানিস্তানের সঙ্গে ভারতের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা পাকিস্তানের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তালেবান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির সাম্প্রতিক ভারত সফর এবং দিল্লিকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে অভিহিত করার বিষয়টি ইসলামাবাদকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। পাকিস্তান মনে করে তাদের ঘেরাও করতে ভারত ও আফগানিস্তান একজোট হয়ে কাজ করছে। একদিকে টিটিপির সশস্ত্র গেরিলা হামলা অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে কাবুলের কৌশলগত আঁতাত পাকিস্তানকে উভয় সংকটে ফেলেছে। ফলে একসময়ের পরম মিত্র দুই দেশ এখন একে অপরের ভূখণ্ডে মরণঘাতী হামলা চালাচ্ছে যা দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই সংঘাত কেবল সীমান্ত সংঘর্ষেই সীমাবদ্ধ থাকবে না কি বড় ধরনের আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেবে তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে।


দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন