সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬, ০৬:৪৪ পিএম
সংবিধানে মৌলিক সংস্কার ও গুণগত পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে বিল অনুমোদনের পরপরই আবারও দেশব্যাপী ঐতিহাসিক গণভোটের আয়োজন করবে সরকার। সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটি স্পষ্টভাবে মনে করছে যে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বিধানে যেকোনো মৌলিক রূপান্তর নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে জনগণের সরাসরি সম্মতি ও রায় গ্রহণ করা অপরিহার্য। রবিবার জাতীয় সংসদ ভবনের ক্যাবিনেট কক্ষে সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে সরকারের এই সুনির্দিষ্ট ও নীতিনির্ধারণী অবস্থান আনুষ্ঠানিকভাবে উঠে আসে।
দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা এই বিশেষ পরামর্শমূলক বৈঠকে গণমাধ্যমের শীর্ষ ব্যক্তিত্বরা সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। দুপুর আড়াইটায় শুরু হয়ে বিকেল সোয়া পাঁচটা পর্যন্ত টানা পরিচালিত এই নীতি-নির্ধারণী বৈঠকে দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমের সম্পাদক, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং সাংবাদিক সংগঠনের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত থেকে সংবিধানের গণতান্ত্রিক সংস্কার বিষয়ে নিজেদের পর্যবেক্ষণ ও প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। বৈঠক শেষে সিনিয়র সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে জানান, সংবিধানের মূল কাঠামোয় প্রস্তাবিত পরিবর্তনের আইনি ভিত্তি নিশ্চিত করতেই সংশোধন-পরবর্তী গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংসদীয় এই বিশেষ কমিটি।
তিনি উল্লেখ করেন, কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বৈঠকে স্পষ্ট করেছেন যে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইনি দলিলেই মৌলিক সংস্কারের ক্ষেত্রে জনগণের সরাসরি ম্যান্ডেটের কথা বলা হয়েছে। যেহেতু বর্তমান প্রক্রিয়ায় সংবিধানে যুগান্তকারী ও সুদূরপ্রসারী মৌলিক পরিবর্তন আনা হচ্ছে, সেহেতু সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা ও বৈধতা রক্ষায় এই গণভোট সম্পাদন করা বাধ্যতামূলক। সরকারের পক্ষ থেকে একে একটি প্রাতিষ্ঠানিক সাংবিধানিক গণভোট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বৈঠকে জানানো হয়, আগামী বছরের শুরুতেই অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে এই বহুল প্রতীক্ষিত সংবিধান সংশোধন বিল পাস করার ব্যাপারে বিশেষ কমিটি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।
এই নির্ধারিত সময়সীমাকে সামনে রেখেই সমাজের সব স্তরের অংশীজন ও বিশেষজ্ঞদের সুচিন্তিত মতামত নিয়ে চূড়ান্ত খসড়া বিলটি প্রস্তুত করার সর্বাত্মক প্রক্রিয়া চলছে। পরামর্শক সভায় অংশ নেওয়া জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে এই সামগ্রিক সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করার জোরালো দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে বিরোধী দলকে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক আস্থায় এনে বিশেষ কমিটির বৈঠকে তাদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা। সাংবাদিকদের এই জাতীয় ঐকমত্যের আহ্বানের জবাবে কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, মূল বিরোধী দলকে বৈঠকের টেবিলে নিয়ে আসার জন্য সরকারের তরফ থেকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সর্বোচ্চ আন্তরিক কূটনৈতিক চেষ্টা চালানো হবে।
তবে বিরোধী দল যদি শেষ পর্যন্ত কমিটির আনুষ্ঠানিক বৈঠকে উপস্থিত হয়ে সরাসরি মতামত নাও দেয়, তবুও জাতীয় সংসদে যখন সংবিধান সংশোধন বিলটি আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপিত হবে, তখন তারা সংসদে বিতর্ক ও আলোচনায় অংশ নিয়ে গঠনমূলক সহযোগিতা করবে বলে বিশেষ কমিটি আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। বৈঠকের সূচনা পর্বে প্রায় ৫০ জন সম্পাদক ও সিনিয়র সংবাদকর্মীর উপস্থিতিতে স্বাগত বক্তব্য দেন কমিটির সভাপতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ।
তিনি মন্তব্য করেন, স্বাধীন গণমাধ্যমের মতামতকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া এবং জাতীয় সনদ সংস্কারে সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতালব্ধ প্রস্তাবনা যেন মৌলিক ভূমিকা রাখে, সেই স্পষ্ট লক্ষ্য নিয়েই এই বৃহৎ মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়েছে। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতার মধ্যে কার্যকর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে উপস্থিত সাংবাদিকেরা সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা তুলে ধরেন।
মুস্তাফিজ শফি জানান, বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোয় নির্বাহী সরকারপ্রধান বা প্রধানমন্ত্রীকে যে বিপুল ও একক কর্তৃত্ব দেওয়া হয়েছে, তা অতীতে রাষ্ট্র ও জাতির সামগ্রিক গণতান্ত্রিক বিকাশের জন্য কখনোই শুভ ফল বয়ে আনেনি বলে সভায় সাংবাদিকেরা সুস্পষ্ট পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। অতীতের সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ক্ষমতার এই বিপজ্জনক ভারসাম্যহীনতা দূর করতে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার রাশ টানা এবং রাষ্ট্রপতির মর্যাদা ও ক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি যেন চলমান সংবিধান সংশোধনীর মূল ধারায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়, সেই সুনির্দিষ্ট সুপারিশও রাখা হয়েছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন